বাংলাদেশের ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা এবং পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য ও চেডল আসনের এমপি টম মরিসন এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি চিঠি দিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।
২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পাঠানো চিঠিতে এমপি টম মরিসন জানান, ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দীপু চন্দ্র দাস একজন তরুণ গার্মেন্টস শ্রমিক ছিলেন এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কর্মস্থলের বাইরে তাঁকে একটি উন্মত্ত জনতা আক্রমণ করে বেধড়ক মারধর করে হত্যা করে। পরবর্তীতে তাঁর নিথর দেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যা ঘটনার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।
প্রাথমিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সূত্রে দাবি করা হয়েছিল, কথিত ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ থেকেই এই সহিংসতার সূত্রপাত। তবে বাংলাদেশ সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পরে জানায়—দীপু দাসের বিরুদ্ধে এমন কোনো মন্তব্য বা ধর্ম অবমাননার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী তদন্ত ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে উঠে আসে, এটি মূলত একটি কর্মস্থল-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে শুরু হয়, যা গুজব, অতিরঞ্জিত অভিযোগ এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণে ভয়াবহ রূপ নেয়।


এমপি মরিসন তাঁর চিঠিতে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, নিরাপত্তার অজুহাতে দীপু দাসকে প্রথমে কর্মস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত তাঁকে একটি উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা, নিরাপত্তা প্রদানে অনীহা এবং ভিড়ের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্রিটিশ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এমপি মরিসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু ব্রিটিশ হিন্দু পরিবারের শিকড় বাংলাদেশে থাকায় তারা গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সাধারণ সামাজিক বা পেশাগত বিরোধকেও ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
চিঠিতে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও, এমপি মরিসন স্পষ্টভাবে বলেন—এই ঘটনা উপেক্ষা করার মতো নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং সহিংস অপরাধে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি পরীক্ষামূলক মুহূর্ত।
তিনি জানতে চান, দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগের কোনো প্রমাণ না থাকার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে কী ধরনের কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা কী—সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চান।
এছাড়াও, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মব সহিংসতা নিয়ে কীভাবে উদ্বেগ জানানো হচ্ছে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
চিঠির শেষাংশে এমপি টম মরিসন বলেন, এই ইস্যুতে যুক্তরাজ্য সরকারের সক্রিয় ভূমিকা এবং ব্রিটিশ হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে—এমন স্পষ্ট বার্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মতামত