গাজিয়াবাদ পুলিশের হাতে ধরা পড়া সন্দেহভাজনদের মধ্যে বিহারের বাসিন্দা নৌশাদকে এই চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নৌশাদকে দেওঘর মন্দিরের পুঙ্খানুপুঙ্খ ভিডিও ফুটেজ এবং জিপিএস লোকেশন সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। গোয়েন্দাদের দাবি, সে সরাসরি পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের নির্দেশে কাজ করত এবং দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ এনক্রিপ্টেড মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাত।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সংগঠিত। নৌশাদ কেবল নিজে তথ্য সংগ্রহ করত না, বরং কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের প্রভাবিত করে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার চেষ্টাও চালাত। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পাকিস্তানি হ্যান্ডলার সরফরাজ নামের এক ব্যক্তি নৌশাদকে একটি বিশেষ এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, যার মাধ্যমে ছবি, ভিডিও ও লোকেশন পাঠানো হতো। এই ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করার মূল উদ্দেশ্য ছিল গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে যাওয়া এবং তথ্য পাচারের নিরাপদ চ্যানেল তৈরি করা।
দেওঘর মন্দির ছাড়াও এই চক্রের নজরে ছিল দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের মতো সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। তদন্তকারীদের মতে, নৌশাদকে সেখানে সেনাবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ভিডিও সংগ্রহ এবং সংবেদনশীল অবস্থান চিহ্নিত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভারতের নিরাপত্তা কাঠামোর একাধিক স্তরে নজরদারির চেষ্টা চলছিল বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত আরেক সন্দেহভাজন মীরা নামে এক মহিলার মোবাইল ফোন থেকে ১০০-র বেশি স্থানের ভিডিও ও জিপিএস লোকেশন উদ্ধার হয়েছে বলে তদন্ত সূত্রে জানা গেছে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ তথ্য কেবল সাধারণ নজরদারির জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে বড়সড় নাশকতার নকশা তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় তীর্থস্থান, জনবহুল এলাকা এবং সামরিক স্থাপনার সুনির্দিষ্ট লোকেশন ও ভিডিও ফুটেজ হাতে থাকলে ড্রোন হামলা, রিমোট-অপারেটেড বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
দেওঘরের বাবা বৈদ্যনাথ ধাম হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে এটি অন্যতম এবং সারা বছর লাখো ভক্ত এখানে পুজো দিতে আসেন। এমন একটি ধর্মীয় আবেগের কেন্দ্রবিন্দুকে লক্ষ্যবস্তু করার অর্থ শুধু একটি স্থাপনায় আঘাত হানা নয়, বরং কোটি কোটি ভক্তের বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে আঘাত করা। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, এই ধরনের পবিত্র তীর্থস্থানকে নিশানা করার পেছনে বড় কোনো নাশকতামূলক পরিকল্পনা বা সন্ত্রাসবাদী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এই গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্কের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের একটি সুসংগঠিত হাওয়ালা চক্রও জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃতদের নিয়মিত অর্থ পাঠানো হতো পাঞ্জাবের একটি হাওয়ালা রুটের মাধ্যমে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং আর্থিক লেনদেনের উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, যেখানে বিদেশি অর্থ এসে জমা হতো। আর্থিক গোয়েন্দারা ‘ফাইন্যান্সিয়াল ট্রেইলিং’ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে, যাতে এই চক্রের পেছনে থাকা বড় মদতদাতাদেরও শনাক্ত করা যায়।
নৌশাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও তদন্ত চলছে। তার গুরুগ্রামে বসবাসকারী এক ঘনিষ্ঠ পরিচিত মহিলাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। তদন্তকারীদের ধারণা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালেও এই নেটওয়ার্কের কিছু যোগাযোগ বা আর্থিক লেনদেন গোপনে পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে। ফলে গোটা মামলাটি এখন বহুস্তরীয় তদন্তের আওতায় এসেছে।
এই গ্রেফতারির পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে। বিশেষ করে ঝাড়খণ্ডের দেওঘর মন্দির, দিল্লির ক্যান্টনমেন্ট এলাকা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলোর নিরাপত্তা অডিট শুরু হয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগে সন্ত্রাস ও চরবৃত্তির ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, আর এই ঘটনায় সেটিই আবারও স্পষ্ট হলো।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সীমান্তের ওপার থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে ভারতের যুবকদের প্রভাবিত করে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করার প্রবণতা। প্রযুক্তি, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের গোপন চ্যানেল—সব মিলিয়ে এই ধরনের নেটওয়ার্ক এখন অনেক বেশি জটিল। তাই শুধু সীমান্ত রক্ষা করলেই হবে না, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল নজরদারি, আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সামাজিক সচেতনতাও সমান জরুরি হয়ে উঠেছে।
বৈদ্যনাথধামকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসা এই সম্ভাব্য নাশকতার ছক একদিকে যেমন ভারতের নিরাপত্তা সংস্থার তৎপরতার সাফল্য তুলে ধরছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে ঘিরে থাকা বিপদের বাস্তবতাও সামনে আনছে। আপাতত ধৃতদের জেরা করে এই চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, কারা এর সঙ্গে জড়িত, এবং আর কোনো ধর্মীয় স্থান বা সামরিক স্থাপনা টার্গেটে ছিল কি না—সেই উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
মতামত