শ্রী হনুমানজি—সনাতন ধর্মের অন্যতম শ্রদ্ধেয়, বীরত্ব, ভক্তি, জ্ঞান ও আত্মনিবেদনের এক অনন্য প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে তিনি কোটি কোটি ভক্তের আরাধ্য, শক্তির উৎস এবং আদর্শের মূর্ত প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন। তবে আধুনিক সময়ে এবং বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে শ্রী হনুমানজিকে ঘিরে একটি পুরনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে—তিনি কি প্রকৃত অর্থে “বানর” বা পশু ছিলেন, নাকি “বানর” ছিল একটি বিশেষ মানবগোষ্ঠী বা জাতির পরিচয়?
এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বহুদিন ধরেই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন গবেষকের মতামত সামনে এসেছে। একদল মানুষ রামায়ণে “বানর” শব্দের সরল অর্থ ধরে শ্রী হনুমানজিকে বানর বা monkey হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। অন্যদিকে বহু শাস্ত্রজ্ঞ, গবেষক ও সনাতনী চিন্তাবিদ মনে করেন, “বানর” শব্দটি এখানে আক্ষরিক অর্থে কোনো পশুকে বোঝায় না; বরং এটি ছিল বনবাসী, বিশেষ চিহ্নধারী, উন্নত সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনে গঠিত এক মানবগোষ্ঠীর নাম।
সনাতনী ঐতিহ্যের অনুসারীরা মনে করেন, রামায়ণ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি ভারতীয় সভ্যতার নৈতিকতা, ধর্ম, কর্তব্য, শৌর্য ও আদর্শের এক মহাগ্রন্থ। সেই মহাগ্রন্থের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রী হনুমানজিকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রচেষ্টা আসলে রামায়ণের ঐতিহাসিকতা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা বলেও অনেকে দাবি করেন। ফলে শ্রী হনুমানজির প্রকৃত পরিচয় নিয়ে শাস্ত্রসম্মত আলোচনা এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাল্মীকি রামায়ণে শ্রী হনুমানজিকে একাধিকবার অসাধারণ জ্ঞানী, বাগ্মী ও বিদ্বান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঋষ্যমূক পর্বতে প্রথম সাক্ষাতে শ্রী রামচন্দ্র স্বয়ং লক্ষ্মণকে উদ্দেশ করে বলেন, এমন পরিশীলিত ও শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা কোনো সাধারণ সত্তার পক্ষে সম্ভব নয়। বাল্মীকি রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে শ্রীরাম হনুমানের ভাষা, উচ্চারণ, ব্যাকরণ-জ্ঞান ও বেদ-অধ্যয়নের প্রশংসা করে স্পষ্টই ইঙ্গিত দেন যে, তিনি ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং ব্যাকরণশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। শ্লোকে বলা হয়েছে—
“নানৃগ্বেদবিনীতস্য নাযজুর্বেদধারিণঃ।
নাসামবেদবিদুষঃ শক্যমেবং প্রভাষিতুম্॥”
এবং পরবর্তী শ্লোকে—
“নূনং ব্যাকরণং কৃত্স্নমনেন বহুধা শ্রুতম্।
বহু ব্যাহরতানেন ন কিঞ্চিদপশব্দিতম্॥”
অর্থাৎ, যিনি ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদে অভিজ্ঞ নন, যিনি ব্যাকরণে সুপণ্ডিত নন, তাঁর পক্ষে এমন শুদ্ধ, পরিমার্জিত ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় কথা বলা সম্ভব নয়। এই বিবরণ থেকেই বহু শাস্ত্রজ্ঞের মতে, শ্রী হনুমানজি কোনো সাধারণ পশু হতে পারেন না; কারণ প্রচলিত বানরজাতি মানুষের মতো শাস্ত্রসম্মত ভাষায় কথা বলতে পারে না, জটিল দর্শন ও রাজনীতি বুঝতে পারে না, কিংবা বেদ-ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারে না।
অশোকবাটিকায় মাতা সীতার সামনে নিজের পরিচয় দেওয়ার আগে হনুমানজির নিজের চিন্তাভাবনাও এই ব্যাখ্যাকে আরও শক্তিশালী করে। তিনি ভাবেন, যদি তিনি দ্বিজাতির মতো শুদ্ধ সংস্কৃত ভাষায় কথা বলেন, তাহলে সীতা তাঁকে রাবণ ভেবে ভয় পেতে পারেন। বাল্মীকি রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে উল্লিখিত—
“যদি বাচং প্রদাস্যামি দ্বিজাতিরিব সংস্কৃতাম্।
রাবণং মন্যমানা মাং সীতা ভীতা ভবিষ্যতি॥”
এই শ্লোকটি স্পষ্টভাবে দেখায়, হনুমানজি কেবল ভাষাজ্ঞানসম্পন্নই নন, বরং সামাজিক মনস্তত্ত্ব, পরিস্থিতি-বিবেচনা ও যোগাযোগকৌশলেও অসাধারণ দক্ষ ছিলেন।
শুধু হনুমানজিই নন, রামায়ণে সুগ্রীব, অঙ্গদ, তারা, বালী প্রমুখ “বানর” চরিত্রদেরও উচ্চবুদ্ধিসম্পন্ন, রাজনীতি-দক্ষ, সংগঠিত সমাজের সদস্য এবং বৈদিক সংস্কৃতির ধারক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অঙ্গদ সম্পর্কে হনুমানজির উক্তি—
“বুদ্ধ্যা হ্যষ্টাঙ্গয়া যুক্তং চতুর্বলসমন্বিতম্।
চতুর্দশ গুণং মেনে হনুমান্ বালিনঃ সুতম্॥”
এখানে অঙ্গদকে অষ্টাঙ্গ বুদ্ধিসম্পন্ন, চার প্রকার বলযুক্ত এবং রাজনীতির চৌদ্দ গুণে গুণান্বিত বলা হয়েছে। এই ধরনের বর্ণনা থেকে গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন—এত উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা, কূটনীতি, সভ্যতা ও শিক্ষায় সমৃদ্ধ সত্তাদের কি কেবল প্রাণী হিসেবে দেখানো যুক্তিযুক্ত?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রামায়ণে “বানর” চরিত্রদের পৃথক পৃথক নাম, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক পদমর্যাদা রয়েছে। সুগ্রীব, হনুমান, বালী, অঙ্গদ, তারা—সবাই নিজস্ব পরিচয় ও ভূমিকা নিয়ে উপস্থিত। বালী ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যার রাজা, সুগ্রীবও পরবর্তীতে রাজা হন, অঙ্গদ ছিলেন রাজকুমার, হনুমান ছিলেন দূত, উপদেষ্টা ও বীরযোদ্ধা। বাস্তবিক অর্থে কোনো পশু-সমাজে রাজা, মন্ত্রী, সভা, দূত, নীতি, কৌশল, জোট, আনুগত্য, রাজ্যাভিষেক এবং বৈদিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো কল্পনা করা কঠিন। তাই বহু গবেষকের মতে, “বানর” এখানে এক বিশেষ মানবসমাজ বা গোষ্ঠীর পরিচয়।
এই বিতর্কে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নিঃসন্দেহে শ্রী হনুমানজির “লেজ”। কারণ সাধারণ মানুষের মনে হনুমানের লেজই তাঁকে বানর হিসেবে ভাবার প্রধান কারণ। কিন্তু রামায়ণ ভাষ্যকার জগদীশ্বরানন্দ সরস্বতীসহ একাধিক পণ্ডিতের মতে, “লাঙ্গুল” বা “লেজ” এখানে শরীরের অঙ্গ নাও হতে পারে; বরং এটি ছিল “বানর” জাতির এক বিশেষ রাষ্ট্রীয় বা সাংস্কৃতিক চিহ্ন, অলংকার বা প্রতীক। রাবণের উক্তি—
“কপীনাং কিল লাঙ্গুলমিষ্টং ভবতি ভূষণম্॥”
এই শ্লোকের ভিত্তিতে ভাষ্যকাররা বলেন, রাবণ নিজেই “লাঙ্গুল”-কে “ভূষণ” বা অলংকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অলংকার সাধারণত শরীরের স্বাভাবিক অঙ্গ নয়; বরং বহন করা হয় পরিচয়, মর্যাদা বা সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হনুমানের লেজ ছিল বানরগোষ্ঠীর টোটেমিক বা জাতিগত পরিচয়ের প্রতীক, যা অপমান করা মানে গোটা জাতিকেই অপমান করা।
গবেষক ডা. শান্তিকুমার নানুরাম ব্যাসও মত দিয়েছেন যে, রামায়ণে বানরদের সংস্কৃতি ছিল উন্নত, সংগঠিত এবং বৈদিক আচার-অনুষ্ঠাননির্ভর। বালীর অন্ত্যেষ্টি এবং সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেক—দুইই বৈদিক বিধিতে সম্পন্ন হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁদের বসনভূষণ, শিক্ষা, সম্পদ, সামাজিক কাঠামো, ধর্মাচরণ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেখে স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, রামায়ণকার তাঁদের প্রকৃত পশু হিসেবে দেখেননি।
ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও “বানর” শব্দের অর্থ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। অনেকে বলেন, “বানর” শব্দটি “বন”-এ বসবাসকারী, বনজাত আহার গ্রহণকারী বা বনবাসী মানবগোষ্ঠীকে নির্দেশ করতে পারে। যেমন “গিরিজন” শব্দ পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষকে বোঝায়, তেমনি “বানর” বনবাসী এক জনগোষ্ঠীর নাম হতে পারে। বাল্মীকি রামায়ণে “বানর” ছাড়াও “বনগোচর”, “বনকোভিদ”, “বনচারী”, “বনৌকস”, “হরি”, “প্লবগ”, “কপি” ইত্যাদি নানা শব্দ ব্যবহার হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব শব্দ আক্ষরিক পশু-পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি একটি জীবনধারা, বসবাসের অঞ্চল বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ইঙ্গিত করে।
টোটেম বা জাতিগত প্রতীক বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক ক্ষীতিমোহন দাস তাঁর গ্রন্থ ভারতবর্ষে জাতিভেদ-এ উল্লেখ করেছেন, প্রাচীন বহু জাতিগোষ্ঠী নিজেদের পরিচয়ের জন্য পশু, পাখি, বৃক্ষ বা বিশেষ প্রতীক ব্যবহার করত। এই প্রতীকই হতো তাদের টোটেম বা লাঞ্ছন। অনেক গোষ্ঠী নিজেদের কোনো পশুর বংশধর বা প্রতীকধারী বলে পরিচয় দিত, যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে মানুষই ছিল। এই প্রেক্ষাপটে “বানর” বা “ভল্লুক” নামধারী গোষ্ঠীগুলিকে প্রাচীন ভারতীয় সমাজে টোটেমিক মানবগোষ্ঠী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
মাতা সীতার সঙ্গে হনুমানজির কথোপকথনও এই ব্যাখ্যাকে আরও জোরদার করে। সুন্দরকাণ্ডে সীতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন—
“সুরাণামসুরাণাম্ চ নাগগন্ধর্ব রক্ষসাম্।
যক্ষাণাং কিন্নরাণাং চ কা ত্বং ভবসি শোভনে॥”
অর্থাৎ, আপনি দেব, অসুর, নাগ, গন্ধর্ব, রাক্ষস, যক্ষ, কিন্নর—কোন কুলের? যদি হনুমানজি কেবল পশু হতেন, তবে সীতা কি তাঁকে এভাবে বিভিন্ন কুল, বংশ বা জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে ফেলতেন? শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নই প্রমাণ করে হনুমানজিকে এক সামাজিক সত্তা, এক বংশপরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তি এবং মানবসমাজের অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছে।
মহাভারতেও বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর নাম পশু-পাখি বা অন্যান্য প্রতীকের নামে পাওয়া যায়। ভীষ্মপর্বে কুকুর, কাক প্রভৃতি নামধারী জাতির উল্লেখ আছে, যাঁরা বাস্তবে মানুষ হলেও তাদের জাতিগত বা প্রতীকী পরিচয় ভিন্ন ছিল। ন্যায়দর্শনের ভাষ্যকার স্বামী দর্শনানন্দ সরস্বতীও জাতিকে “সামান্য” ও “বিশেষ”—এই দুইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, “মনুষ্য” একটি সাধারণ জাতি; এর ভেতরে দেশ, আচার, বর্ণ, বৈশিষ্ট্য বা চিহ্নভেদে নানা “বিশেষ” জাতি গঠিত হয়। সেই আলোকে “বানর”কে এক বিশেষ মানবগোষ্ঠী বা উপ-জাতি হিসেবে দেখার যুক্তিও সামনে আনা হয়।
সনাতনী সমাজের একাংশ মনে করেন, শ্রী হনুমানজিকে “শুধু বানর” হিসেবে সরলীকরণ করা তাঁর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে সংকুচিত করে। তাঁদের মতে, শ্রী হনুমানজি ছিলেন পরম ভক্ত, মহাজ্ঞানী, অদম্য যোদ্ধা, রাষ্ট্রনৈতিকভাবে দক্ষ, ভাষায় পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ এবং এক উন্নত বনবাসী বা টোটেমিক মানবগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। অন্যদিকে অনেক ভক্ত আবার ভক্তিভাব থেকেই তাঁকে দিব্যবানর বা ঈশ্বরীয় শক্তিধারী রূপে মানেন, যা আক্ষরিক ইতিহাসের চেয়ে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিষয়। ফলে এই বিতর্কে শাস্ত্রীয়, প্রতীকী ও ভক্তিমূলক—তিনটি স্তরই সক্রিয় রয়েছে।
তবে একটি বিষয় প্রায় সব পক্ষই মানেন—শ্রী হনুমানজি কেবল কোনো সাধারণ চরিত্র নন; তিনি সনাতন ধর্মের শক্তি, নিষ্ঠা, সেবা, জ্ঞান ও ভক্তির এক অনন্ত প্রতীক। তিনি পশু ছিলেন, নাকি বিশেষ মানবগোষ্ঠীর প্রতিনিধি—এই বিতর্কের বাইরে গিয়েও তাঁর চরিত্রের মূল শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক: ভক্তি, বীরত্ব, বিনয়, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং ধর্মরক্ষার আদর্শ।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞদের মত, রামায়ণের চরিত্র ও শব্দগুলিকে কেবল আধুনিক অভিধানের সরল অর্থে বিচার করলে বহু গভীর সাংস্কৃতিক স্তর অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই “বানর” শব্দের আক্ষরিক অর্থের বাইরে গিয়ে শাস্ত্র, ভাষ্য, ইতিহাস, প্রত্ন-মানস, সমাজতত্ত্ব ও টোটেমিক সংস্কৃতির আলোকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। শ্রী হনুমানজিকে ঘিরে বিতর্ক যতই থাকুক, তাঁর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য সনাতন ঐতিহ্যে চিরঅম্লান।
মতামত