অবিভক্ত ভারতের আধ্যাত্মিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এবং জ্ঞানালোকের অন্যতম উৎসভূমি শারদা পীঠ আজ কেবলই এক ধূসর ইতিহাস। বর্তমান পাকিস্তানের তথাকথিত ‘আজাদ কাশ্মীরের’ নীলম উপত্যকায় কিষাণগঙ্গা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহাশক্তিপীঠটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র হলেও দেশভাগের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় তা আজ জনমানবহীন ও পরিত্যক্ত। দেবী সরস্বতীর ১৮টি মহাশক্তিপীঠের অন্যতম এই পবিত্র স্থানটি একসময় বিশ্বজুড়ে ‘শারদা দেশ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, যা আজ কেবল হারানো গৌরবের করুণ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছে।
অষ্টম শতাব্দীতে কাশ্মীরি সম্রাট ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় কর্তৃক নির্মিত এই মন্দিরটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। নালন্দা বা তক্ষশিলার মতোই শারদা পীঠ এক বিশাল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সমাদৃত ছিল। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রাচীন ‘শারদা লিপি’, যা হিমালয় অঞ্চলের জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যিক ভিত্তিকে সুসংগঠিত করেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যা ও আধ্যাত্মিকতার এই অনন্য মিলনস্থলটি আজ রাজনৈতিক ও সামরিক জটিলতার কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভৌগোলিক সীমানার মারপ্যাঁচে এবং নিয়ন্ত্রণ রেখার (LoC) অতি নিকটে অবস্থানের কারণে শারদা পীঠ সাধারণ মানুষের জন্য দুর্গম হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সীমান্তবর্তী উত্তেজনার ফলে সেখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা ও ভক্তদের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একসময়ের মুখরিত এই জ্ঞানতীর্থটি এখন পাথুরে ধ্বংসাবশেষের স্তূপে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বৈদেশিক আক্রমণের ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যটি যেন ছিন্নমূল সংস্কৃতির এক বোবা কান্না।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাশ্মীরি পণ্ডিত এবং ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে শারদা পীঠ আজও এক গভীর বেদনার নাম। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মন্দিরটি পুনরায় চালু করার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা এখনো অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা হয়েই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা আর অযত্নে বিলীন হতে চলা এই স্থাপনাটি যেন সভ্যতার এক নীরব সাক্ষী, যা আজও তার হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে।
মতামত