কিন্তু এই চরম অন্ধকারের মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের পরম উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। সিন্ধুতাই লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁর মতো বহু অনাথ শিশু স্টেশনে বা রাস্তায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। তিনি নিজের এক ফোঁটা খাবারের ভাগ সেই শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শুরু করেন। যে মানুষটির নিজের থাকার জায়গা ছিল না, তিনি একে একে অনাথ শিশুদের নিজের সন্তানের মতো আগলে নিতে শুরু করেন। তিনি ভাবতেন, ঈশ্বর যখন তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তখন এই অসহায় শিশুদের মা হওয়াই তাঁর ধর্ম। নিজের সন্তান আর কুড়িয়ে পাওয়া অনাথ শিশুদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গান গাইতেন, মানুষের দুয়ারে হাত পাততেন। ধীরে ধীরে তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ বুঝতে পারে, এই নারী কেবল একজন সাধারণ ভিক্ষুক নন, তিনি এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারিণী।
সিন্ধুতাই যখন নিজের অনাথ আশ্রম তৈরি করার পরিকল্পনা করেন, তখন তাঁর সামনে পাহাড়প্রমাণ বাধা ছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি বলতেন, ক্ষুধা তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে বাঁচতে হয়। তিনি সারা ভারত ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছেন, বক্তৃতার মাধ্যমে অর্থ জোগাড় করেছেন। তাঁর সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁর জীবনে প্রায় ১৪০০-র বেশি অনাথ শিশুকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছেন। আজ তাঁর সেই সন্তানদের মধ্যে কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ বা বড় উকিল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক পর যখন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ হয়ে অসুস্থ অবস্থায় তাঁর কাছে ফিরে আসেন, তখন সিন্ধুতাই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং তাঁকে নিজের 'বড় সন্তান' হিসেবে আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ক্ষমার এই অনন্য নিদর্শন পৃথিবীতে বিরল।
ভারত সরকার তাঁর এই অসামান্য ত্যাগের জন্য ২০২১ সালে তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'পদ্মশ্রী' প্রদান করে। এছাড়া তিনি সাতশোরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। যে মানুষটি একদিন ট্রেনের পাদানিতে বসে ভিক্ষা করতেন, সেই মানুষটিই ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে যখন সম্মান নিচ্ছিলেন, তখন গোটা বিশ্ব দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল। সিন্ধুতাই প্রমাণ করেছিলেন, যার কেউ নেই তার জন্য ভগবান কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দেন। ২০২২ সালে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর গড়ে যাওয়া আদর্শ আজও অনাথদের মাথার ওপর ছাদের মতো হয়ে আছে। তাঁর এই জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস আর মনের জোর থাকে, তবে শূন্য থেকেও এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়া সম্ভব। মা হওয়া মানে কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া নয়, মা হওয়া মানে সবার দুঃখ নিজের বুকে টেনে নেওয়া—এই সত্যই তিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেছেন।
মতামত