শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

১৪০০ অনাথের মা: একবিংশ শতাব্দীর দেবী অন্নপূর্ণা সিন্ধুতাইয়ের জীবন-সংগ্রাম


| প্রিন্ট সংস্করণ

১৪০০ অনাথের মা: একবিংশ শতাব্দীর দেবী অন্নপূর্ণা সিন্ধুতাইয়ের জীবন-সংগ্রাম
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
প্রসব যন্ত্রণায় এক নারী ছটফট করছেন গোয়ালঘরের এক কোণে। চারপাশ নিস্তব্ধ আর অন্ধকারে ডুবে আছে গ্রাম। ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের গর্ভজাত সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখালেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর নাড়ি কাটার জন্য পাশে কেউ ছিল না। নিজের হাতের কাছে পাওয়া একটা ধারালো পাথর দিয়ে ১৬ বার আঘাত করে নিজের নাড়ি নিজে কেটেছিলেন তিনি। এই নারী কোনো কাল্পনিক চরিত্রের কেউ নন, তিনি হলেন ভারতের 'মাদার অফ অরফ্যানস' খ্যাত পদ্মশ্রী সিন্ধুতাই সাপকাল। তাঁর এই অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধ হার মানাবে যেকোনো সিনেমার গল্পকেও।


​সিন্ধুতাইয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৮ সালে মহারাষ্ট্রের এক অতি দরিদ্র পরিবারে। জন্মের পর থেকেই তিনি ছিলেন অবহেলিত। মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর চেয়ে ২০ বছরের বড় এক লোকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পড়াশোনার প্রতি প্রবল টান থাকলেও শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে কলম ধরার সুযোগ মেলেনি তাঁর। ২০ বছর বয়সে যখন তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন স্বামী কেবল সন্দেহের বশে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এমনকি গ্রামের মোড়লদের ইন্ধনে তাঁর নিজের মা-ও তাঁকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই রাতেই তিনি গোয়ালঘরে আশ্রয় নেন এবং নিজের কন্যাসন্তানকে জন্ম দেন। পেটের টানে আর বাঁচার তাগিদে তিনি রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গান গেয়ে ভিক্ষা করা শুরু করেন। রাতে যখন ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা খাবার ফেলে দিতেন, তখন সেই এঁটো খাবার কুড়িয়ে খেতেন তিনি এবং তাঁর কোলের শিশু। শ্মশানে চিতায় পোড়ানো লাশের পাশ থেকে পড়ে থাকা রুটি সেঁকে খাওয়ার মতো চরম দুর্দিনও তাঁকে পার করতে হয়েছে।

​কিন্তু এই চরম অন্ধকারের মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের পরম উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। সিন্ধুতাই লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁর মতো বহু অনাথ শিশু স্টেশনে বা রাস্তায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। তিনি নিজের এক ফোঁটা খাবারের ভাগ সেই শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শুরু করেন। যে মানুষটির নিজের থাকার জায়গা ছিল না, তিনি একে একে অনাথ শিশুদের নিজের সন্তানের মতো আগলে নিতে শুরু করেন। তিনি ভাবতেন, ঈশ্বর যখন তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তখন এই অসহায় শিশুদের মা হওয়াই তাঁর ধর্ম। নিজের সন্তান আর কুড়িয়ে পাওয়া অনাথ শিশুদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গান গাইতেন, মানুষের দুয়ারে হাত পাততেন। ধীরে ধীরে তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ বুঝতে পারে, এই নারী কেবল একজন সাধারণ ভিক্ষুক নন, তিনি এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারিণী।

​সিন্ধুতাই যখন নিজের অনাথ আশ্রম তৈরি করার পরিকল্পনা করেন, তখন তাঁর সামনে পাহাড়প্রমাণ বাধা ছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি বলতেন, ক্ষুধা তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে বাঁচতে হয়। তিনি সারা ভারত ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছেন, বক্তৃতার মাধ্যমে অর্থ জোগাড় করেছেন। তাঁর সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁর জীবনে প্রায় ১৪০০-র বেশি অনাথ শিশুকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছেন। আজ তাঁর সেই সন্তানদের মধ্যে কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ বা বড় উকিল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক পর যখন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ হয়ে অসুস্থ অবস্থায় তাঁর কাছে ফিরে আসেন, তখন সিন্ধুতাই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং তাঁকে নিজের 'বড় সন্তান' হিসেবে আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ক্ষমার এই অনন্য নিদর্শন পৃথিবীতে বিরল।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

​ভারত সরকার তাঁর এই অসামান্য ত্যাগের জন্য ২০২১ সালে তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'পদ্মশ্রী' প্রদান করে। এছাড়া তিনি সাতশোরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। যে মানুষটি একদিন ট্রেনের পাদানিতে বসে ভিক্ষা করতেন, সেই মানুষটিই ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে যখন সম্মান নিচ্ছিলেন, তখন গোটা বিশ্ব দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল। সিন্ধুতাই প্রমাণ করেছিলেন, যার কেউ নেই তার জন্য ভগবান কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দেন। ২০২২ সালে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর গড়ে যাওয়া আদর্শ আজও অনাথদের মাথার ওপর ছাদের মতো হয়ে আছে। তাঁর এই জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস আর মনের জোর থাকে, তবে শূন্য থেকেও এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়া সম্ভব। মা হওয়া মানে কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া নয়, মা হওয়া মানে সবার দুঃখ নিজের বুকে টেনে নেওয়া—এই সত্যই তিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেছেন।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


১৪০০ অনাথের মা: একবিংশ শতাব্দীর দেবী অন্নপূর্ণা সিন্ধুতাইয়ের জীবন-সংগ্রাম

প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image
প্রসব যন্ত্রণায় এক নারী ছটফট করছেন গোয়ালঘরের এক কোণে। চারপাশ নিস্তব্ধ আর অন্ধকারে ডুবে আছে গ্রাম। ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের গর্ভজাত সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখালেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর নাড়ি কাটার জন্য পাশে কেউ ছিল না। নিজের হাতের কাছে পাওয়া একটা ধারালো পাথর দিয়ে ১৬ বার আঘাত করে নিজের নাড়ি নিজে কেটেছিলেন তিনি। এই নারী কোনো কাল্পনিক চরিত্রের কেউ নন, তিনি হলেন ভারতের 'মাদার অফ অরফ্যানস' খ্যাত পদ্মশ্রী সিন্ধুতাই সাপকাল। তাঁর এই অবিশ্বাস্য জীবনযুদ্ধ হার মানাবে যেকোনো সিনেমার গল্পকেও।


​সিন্ধুতাইয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৮ সালে মহারাষ্ট্রের এক অতি দরিদ্র পরিবারে। জন্মের পর থেকেই তিনি ছিলেন অবহেলিত। মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর চেয়ে ২০ বছরের বড় এক লোকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পড়াশোনার প্রতি প্রবল টান থাকলেও শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে কলম ধরার সুযোগ মেলেনি তাঁর। ২০ বছর বয়সে যখন তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন স্বামী কেবল সন্দেহের বশে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এমনকি গ্রামের মোড়লদের ইন্ধনে তাঁর নিজের মা-ও তাঁকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই রাতেই তিনি গোয়ালঘরে আশ্রয় নেন এবং নিজের কন্যাসন্তানকে জন্ম দেন। পেটের টানে আর বাঁচার তাগিদে তিনি রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গান গেয়ে ভিক্ষা করা শুরু করেন। রাতে যখন ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা খাবার ফেলে দিতেন, তখন সেই এঁটো খাবার কুড়িয়ে খেতেন তিনি এবং তাঁর কোলের শিশু। শ্মশানে চিতায় পোড়ানো লাশের পাশ থেকে পড়ে থাকা রুটি সেঁকে খাওয়ার মতো চরম দুর্দিনও তাঁকে পার করতে হয়েছে।

​কিন্তু এই চরম অন্ধকারের মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের পরম উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। সিন্ধুতাই লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁর মতো বহু অনাথ শিশু স্টেশনে বা রাস্তায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। তিনি নিজের এক ফোঁটা খাবারের ভাগ সেই শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শুরু করেন। যে মানুষটির নিজের থাকার জায়গা ছিল না, তিনি একে একে অনাথ শিশুদের নিজের সন্তানের মতো আগলে নিতে শুরু করেন। তিনি ভাবতেন, ঈশ্বর যখন তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তখন এই অসহায় শিশুদের মা হওয়াই তাঁর ধর্ম। নিজের সন্তান আর কুড়িয়ে পাওয়া অনাথ শিশুদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গান গাইতেন, মানুষের দুয়ারে হাত পাততেন। ধীরে ধীরে তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ বুঝতে পারে, এই নারী কেবল একজন সাধারণ ভিক্ষুক নন, তিনি এক বিশাল হৃদয়ের অধিকারিণী।

​সিন্ধুতাই যখন নিজের অনাথ আশ্রম তৈরি করার পরিকল্পনা করেন, তখন তাঁর সামনে পাহাড়প্রমাণ বাধা ছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি বলতেন, ক্ষুধা তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে বাঁচতে হয়। তিনি সারা ভারত ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছেন, বক্তৃতার মাধ্যমে অর্থ জোগাড় করেছেন। তাঁর সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁর জীবনে প্রায় ১৪০০-র বেশি অনাথ শিশুকে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছেন। আজ তাঁর সেই সন্তানদের মধ্যে কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ বা বড় উকিল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক পর যখন তাঁর স্বামী বৃদ্ধ হয়ে অসুস্থ অবস্থায় তাঁর কাছে ফিরে আসেন, তখন সিন্ধুতাই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং তাঁকে নিজের 'বড় সন্তান' হিসেবে আশ্রমে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ক্ষমার এই অনন্য নিদর্শন পৃথিবীতে বিরল।

​ভারত সরকার তাঁর এই অসামান্য ত্যাগের জন্য ২০২১ সালে তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'পদ্মশ্রী' প্রদান করে। এছাড়া তিনি সাতশোরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। যে মানুষটি একদিন ট্রেনের পাদানিতে বসে ভিক্ষা করতেন, সেই মানুষটিই ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে যখন সম্মান নিচ্ছিলেন, তখন গোটা বিশ্ব দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল। সিন্ধুতাই প্রমাণ করেছিলেন, যার কেউ নেই তার জন্য ভগবান কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দেন। ২০২২ সালে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর গড়ে যাওয়া আদর্শ আজও অনাথদের মাথার ওপর ছাদের মতো হয়ে আছে। তাঁর এই জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস আর মনের জোর থাকে, তবে শূন্য থেকেও এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়া সম্ভব। মা হওয়া মানে কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া নয়, মা হওয়া মানে সবার দুঃখ নিজের বুকে টেনে নেওয়া—এই সত্যই তিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে গেছেন।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
১৪০০ অনাথের মা: একবিংশ শতাব্দীর দেবী অন্নপূর্ণা সিন্ধুতাইয়ের জীবন-সংগ্রাম
0:00 0:00
1.0x