শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
হিন্দুস নিউজ
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

মরিচঝাঁপি গণহত্যা: পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনামলে হিন্দু উদ্বাস্তুর রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর ইতিহাস


| প্রিন্ট সংস্করণ

মরিচঝাঁপি গণহত্যা: পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনামলে হিন্দু উদ্বাস্তুর রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর ইতিহাস
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

“মোর ঘর হারা হয়েছি, হয়েছি দেশান্তরী, খুঁজেছি একটু ঠাঁই। শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় এসে দেখি, আমি উদ্বাস্তু, আপন কেহই নাই”—এই আর্তনাদ যেন শুধু একটি কবিতার চরণ নয়, বরং দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব বাংলার অসংখ্য হিন্দু উদ্বাস্তুর জীবনবেদনার এক নির্মম দলিল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নির্যাতন, ভিটেমাটি হারানো আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্কে পূর্ব বাংলার বহু হিন্দু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। তারা ভেবেছিল, অন্তত এখানে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই আশ্রয়স্থলেই একদিন রচিত হয়েছিল স্বাধীনোত্তর ভারতের অন্যতম নির্মম উদ্বাস্তু-নির্যাতনের অধ্যায়—মরিচঝাঁপি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিলেও, লাখো মানুষের জীবনকে নিক্ষেপ করেছিল এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে। পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সামাজিক বঞ্চনা, ধর্মীয় নিপীড়ন এবং ক্রমাগত অনিরাপত্তার পরিবেশে বহু হিন্দু পরিবার বাধ্য হয় পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে। উচ্চবিত্ত বা সচ্ছলদের কেউ কেউ পশ্চিমবঙ্গের শহর ও মফস্বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও, নিম্নবর্ণ, দলিত ও দরিদ্র বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা সেই সুযোগ পাননি। তাদের বড় অংশকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতের বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের আওতায় বর্তমান ছত্তিশগড়, ওডিশা, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার বিস্তীর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে। বাল্মিকী রামায়ণে বর্ণিত দণ্ডকারণ্য যেখানে একসময় ভগবান শ্রীরাম, মাতা সীতা ও ভ্রাতা লক্ষ্মণের বনবাসের স্মৃতিবাহী, সেই দণ্ডকারণ্যই বিংশ শতকে হাজার হাজার দরিদ্র বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুর জন্য হয়ে উঠেছিল বাস্তবের নির্মম বনবাস।

এই দুর্বিষহ জীবনের মধ্যেই একসময় আশার আলো দেখেছিল উদ্বাস্তু পরিবারগুলো। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির উত্থানের সময় উদ্বাস্তুদের প্রতি সহানুভূতির ভাষণ এবং তাদের পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বহু মানুষের মনে নতুন করে স্বপ্ন জাগায়। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ভিলাইয়ের এক জনসভায় জ্যোতি বসু দণ্ডকারণ্যে থাকা উদ্বাস্তুর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ক্ষমতায় আসার আগেই সিপিএমের কয়েকজন নেতা দণ্ডকারণ্যে গিয়ে উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবঙ্গে ফিরলে ৫ কোটি বাঙালি ১০ কোটি হাত তুলে তাঁদের স্বাগত জানাবে—এমন বার্তাও পৌঁছে দিয়েছিলেন বলে বহু বিবরণে উঠে এসেছে। এই প্রতিশ্রুতি ছিল বহু উদ্বাস্তু পরিবারের কাছে শুধু রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দণ্ডকারণ্যে থাকা বহু উদ্বাস্তু পরিবার সেই প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করে নিজেদের সামান্য সহায়-সম্বল বিক্রি করে পশ্চিমবঙ্গের পথে রওনা দেয়। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, প্রায় দেড় লক্ষাধিক উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষমতায় আসার পর বাম সরকার তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসে এবং উদ্বাস্তুর পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পথ কার্যত বন্ধ করে দেয়। বহু মানুষকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয় দণ্ডকারণ্যে। তবু সবাই ফিরে যায়নি। প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি উদ্বাস্তু সুন্দরবনের কোলঘেঁষা মরিচঝাঁপি দ্বীপে আশ্রয় নেন।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মরিচঝাঁপি দ্বীপে সেই উদ্বাস্তু মানুষগুলো নিজেদের অদম্য পরিশ্রমে গড়ে তুলতে শুরু করেন এক নতুন জীবন। জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি গড়ে তোলেন, জমি আবাদ করেন, মাছের ঘের তৈরি করেন, নৌকায় যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন, এমনকি একটি স্বনির্ভর জনপদ নির্মাণের স্বপ্নও দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘ উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে সেখানে তারা যেন নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস ফিরে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্থায়ী হয়নি। খুব দ্রুতই প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মরিচঝাঁপি খালি করতে হবে। সরকারি যুক্তি ছিল—এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, এখানে মানুষের বসতি সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। তবে বহু গবেষক, ইতিহাস-অনুসন্ধানী ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে দাবি করা হয়েছে, মরিচঝাঁপির বসতি যে অংশে গড়ে উঠেছিল তা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল মানচিত্রের বাইরে ছিল, এবং এই ‘পরিবেশ’ যুক্তি ছিল আসলে উদ্বাস্তু উচ্ছেদের রাজনৈতিক অজুহাত।

১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয় মরিচঝাঁপি অধ্যায়ের সবচেয়ে অন্ধকার পর্ব। ২৪ জানুয়ারি থেকে দ্বীপটিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। পুলিশ ও প্রশাসনের নজরদারিতে নৌপথে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়, খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঢোকা বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। ২৬ জানুয়ারি থেকে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয় এবং সংবাদমাধ্যমের প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয় বলে বহু বিবরণে উঠে এসেছে। এই অবরোধে দ্বীপের বাসিন্দারা ক্রমে খাদ্য ও পানির সংকটে পড়ে। শরণার্থীদের একমাত্র ভরসা ছিল স্থানীয় জল, সামান্য সঞ্চিত খাদ্য এবং নিজেদের সংগ্রহ করা সামগ্রী। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মজুত ফুরিয়ে যায়। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা অনাহার, অপুষ্টি ও অসুস্থতায় দুর্বল হয়ে পড়তে থাকেন।

অবরোধের মধ্যেই এক পর্যায়ে কিছু উদ্বাস্তু পাশের এলাকা থেকে খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়—এমন অভিযোগ বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী বয়ানে উঠে এসেছে। বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি কয়েকজন যুবক কুমিরমারী দিক থেকে খাদ্য আনতে গেলে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করার সময় তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে বহু মানুষ হতাহত হন বলে দাবি করা হয়। যদিও সরকারি নথিতে এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, তবুও মরিচঝাঁপি নিয়ে রচিত বহু গবেষণা, সাক্ষ্য ও স্মৃতিকথায় এই দিনটিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু অবরোধ, অনাহার, আতঙ্ক ও গুলিবর্ষণের পরও মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুরা দ্বীপ ছাড়েননি। তারা বেঁচে থাকার শেষ লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। আর ঠিক সেই কারণেই ১৯৭৯ সালের মে মাসে শুরু হয় আরও ভয়াবহ উচ্ছেদ অভিযান। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী, মানবাধিকারকর্মী ও পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত লেখালেখিতে দাবি করা হয়েছে, ১৩ মে গভীর রাত থেকে দ্বীপজুড়ে নৃশংস দমন অভিযান চালানো হয়। ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো হয়, বসতি ভেঙে ফেলা হয়, বহু মানুষকে মারধর, গুলি এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগও উঠে আসে বিভিন্ন বিবরণে। অনেকে আগুনে পুড়ে মারা যান, অনেকে পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে যান, অনেকে নিখোঁজ হয়ে যান। সেই রাতের বর্ণনা বহু মানুষের কাছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন, যা স্বাধীনোত্তর ভারতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

মরিচঝাঁপি গণহত্যায় প্রকৃত কত মানুষ নিহত হয়েছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত সংখ্যা আজও অজানা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও মানবাধিকারভিত্তিক বিবরণে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত অনাহার, চিকিৎসার অভাব, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিছু বিবরণে দাবি করা হয়, অবরোধকালীন অনাহারে ৯৪ জন এবং চিকিৎসাহীনতায় ১৭৭ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে। আবার কোথাও বলা হয়েছে, সরাসরি সহিংসতায় অন্তত ২৩৯ জন নিহত এবং ১২৮ জন নিখোঁজ হন। ধর্ষণের শিকার হন বহু নারী। তবে এই সংখ্যাগুলোর সরকারি যাচাই আজও হয়নি। কারণ, এই ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ সরকারি তদন্ত হয়নি—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরেই ইতিহাসবিদ, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়ে আসছে। ফলে মরিচঝাঁপি আজও শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং ইতিহাসের এমন এক ক্ষত, যার গভীরতা অনুমান করা যায়, কিন্তু সম্পূর্ণ মাপা যায় না।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—যারা পূর্ব বাংলার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নোয়াখালী ও খুলনার দাঙ্গা, ১৯৭১-এর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা এবং দীর্ঘ উদ্বাস্তু জীবনের দুঃসহ স্মৃতি বয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারাই আবার নিজেদের তথাকথিত আশ্রয়স্থলে দ্বিতীয়বার নির্মমতার শিকার হলেন। যাদের কাছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল নিরাপত্তার আশ্বাস, তাদের জন্য সেই প্রতিশ্রুতিই হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের এক ভয়ংকর প্রতারণা। মরিচঝাঁপি তাই কেবল একটি উচ্ছেদ অভিযান নয়; এটি উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুদের বেঁচে থাকার আকুতি, রাষ্ট্রীয় অবহেলা, রাজনৈতিক প্রতারণা এবং ক্ষমতার নির্মম প্রয়োগের এক অমোচনীয় দলিল।

বাংলা সাহিত্য, স্মৃতিকথা ও জনমানসে মরিচঝাঁপি আজও বেঁচে আছে। বহু লেখক, কবি ও গবেষকের কলমে এই ঘটনার উল্লেখ এসেছে। ইতিহাসের মূলধারায় দীর্ঘদিন প্রান্তিক হয়ে থাকলেও, মরিচঝাঁপি নিয়ে প্রশ্ন কখনও মুছে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জোরালো হয়েছে সেই দাবি—এই ঘটনার পূর্ণ সত্য উন্মোচন হোক, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা সামনে আসুক, এবং উদ্বাস্তুদের উপর সংঘটিত এই নির্মম অধ্যায় যথাযথভাবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হোক।

মরিচঝাঁপি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশভাগের ক্ষত শুধু সীমান্ত টেনে শেষ হয়নি; সেই ক্ষত বহন করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। উদ্বাস্তুদের কাছে রাষ্ট্র, রাজনীতি, মতাদর্শ বা ক্ষমতার ভাষণ নয়—সবচেয়ে বড় সত্য ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের ইতিহাসে মরিচঝাঁপি এক রক্তাক্ত, বেদনাময় এবং কখনও ভোলা না যাওয়ার মতো নাম।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মরিচঝাঁপি গণহত্যা: পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনামলে হিন্দু উদ্বাস্তুর রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর ইতিহাস

প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

“মোর ঘর হারা হয়েছি, হয়েছি দেশান্তরী, খুঁজেছি একটু ঠাঁই। শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় এসে দেখি, আমি উদ্বাস্তু, আপন কেহই নাই”—এই আর্তনাদ যেন শুধু একটি কবিতার চরণ নয়, বরং দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ব বাংলার অসংখ্য হিন্দু উদ্বাস্তুর জীবনবেদনার এক নির্মম দলিল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নির্যাতন, ভিটেমাটি হারানো আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্কে পূর্ব বাংলার বহু হিন্দু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। তারা ভেবেছিল, অন্তত এখানে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই আশ্রয়স্থলেই একদিন রচিত হয়েছিল স্বাধীনোত্তর ভারতের অন্যতম নির্মম উদ্বাস্তু-নির্যাতনের অধ্যায়—মরিচঝাঁপি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিলেও, লাখো মানুষের জীবনকে নিক্ষেপ করেছিল এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে। পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সামাজিক বঞ্চনা, ধর্মীয় নিপীড়ন এবং ক্রমাগত অনিরাপত্তার পরিবেশে বহু হিন্দু পরিবার বাধ্য হয় পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে। উচ্চবিত্ত বা সচ্ছলদের কেউ কেউ পশ্চিমবঙ্গের শহর ও মফস্বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও, নিম্নবর্ণ, দলিত ও দরিদ্র বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরা সেই সুযোগ পাননি। তাদের বড় অংশকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতের বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের আওতায় বর্তমান ছত্তিশগড়, ওডিশা, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার বিস্তীর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে। বাল্মিকী রামায়ণে বর্ণিত দণ্ডকারণ্য যেখানে একসময় ভগবান শ্রীরাম, মাতা সীতা ও ভ্রাতা লক্ষ্মণের বনবাসের স্মৃতিবাহী, সেই দণ্ডকারণ্যই বিংশ শতকে হাজার হাজার দরিদ্র বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুর জন্য হয়ে উঠেছিল বাস্তবের নির্মম বনবাস।

এই দুর্বিষহ জীবনের মধ্যেই একসময় আশার আলো দেখেছিল উদ্বাস্তু পরিবারগুলো। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনীতির উত্থানের সময় উদ্বাস্তুদের প্রতি সহানুভূতির ভাষণ এবং তাদের পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বহু মানুষের মনে নতুন করে স্বপ্ন জাগায়। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ভিলাইয়ের এক জনসভায় জ্যোতি বসু দণ্ডকারণ্যে থাকা উদ্বাস্তুর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ক্ষমতায় আসার আগেই সিপিএমের কয়েকজন নেতা দণ্ডকারণ্যে গিয়ে উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবঙ্গে ফিরলে ৫ কোটি বাঙালি ১০ কোটি হাত তুলে তাঁদের স্বাগত জানাবে—এমন বার্তাও পৌঁছে দিয়েছিলেন বলে বহু বিবরণে উঠে এসেছে। এই প্রতিশ্রুতি ছিল বহু উদ্বাস্তু পরিবারের কাছে শুধু রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।

১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দণ্ডকারণ্যে থাকা বহু উদ্বাস্তু পরিবার সেই প্রতিশ্রুতির উপর ভরসা করে নিজেদের সামান্য সহায়-সম্বল বিক্রি করে পশ্চিমবঙ্গের পথে রওনা দেয়। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, প্রায় দেড় লক্ষাধিক উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষমতায় আসার পর বাম সরকার তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসে এবং উদ্বাস্তুর পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পথ কার্যত বন্ধ করে দেয়। বহু মানুষকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয় দণ্ডকারণ্যে। তবু সবাই ফিরে যায়নি। প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি উদ্বাস্তু সুন্দরবনের কোলঘেঁষা মরিচঝাঁপি দ্বীপে আশ্রয় নেন।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মরিচঝাঁপি দ্বীপে সেই উদ্বাস্তু মানুষগুলো নিজেদের অদম্য পরিশ্রমে গড়ে তুলতে শুরু করেন এক নতুন জীবন। জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি গড়ে তোলেন, জমি আবাদ করেন, মাছের ঘের তৈরি করেন, নৌকায় যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন, এমনকি একটি স্বনির্ভর জনপদ নির্মাণের স্বপ্নও দেখতে শুরু করেন। দীর্ঘ উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা পেরিয়ে সেখানে তারা যেন নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস ফিরে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন স্থায়ী হয়নি। খুব দ্রুতই প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মরিচঝাঁপি খালি করতে হবে। সরকারি যুক্তি ছিল—এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, এখানে মানুষের বসতি সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। তবে বহু গবেষক, ইতিহাস-অনুসন্ধানী ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে দাবি করা হয়েছে, মরিচঝাঁপির বসতি যে অংশে গড়ে উঠেছিল তা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল মানচিত্রের বাইরে ছিল, এবং এই ‘পরিবেশ’ যুক্তি ছিল আসলে উদ্বাস্তু উচ্ছেদের রাজনৈতিক অজুহাত।

১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয় মরিচঝাঁপি অধ্যায়ের সবচেয়ে অন্ধকার পর্ব। ২৪ জানুয়ারি থেকে দ্বীপটিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। পুলিশ ও প্রশাসনের নজরদারিতে নৌপথে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়, খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঢোকা বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। ২৬ জানুয়ারি থেকে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয় এবং সংবাদমাধ্যমের প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয় বলে বহু বিবরণে উঠে এসেছে। এই অবরোধে দ্বীপের বাসিন্দারা ক্রমে খাদ্য ও পানির সংকটে পড়ে। শরণার্থীদের একমাত্র ভরসা ছিল স্থানীয় জল, সামান্য সঞ্চিত খাদ্য এবং নিজেদের সংগ্রহ করা সামগ্রী। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মজুত ফুরিয়ে যায়। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা অনাহার, অপুষ্টি ও অসুস্থতায় দুর্বল হয়ে পড়তে থাকেন।

অবরোধের মধ্যেই এক পর্যায়ে কিছু উদ্বাস্তু পাশের এলাকা থেকে খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়—এমন অভিযোগ বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী বয়ানে উঠে এসেছে। বলা হয়, ৩১ জানুয়ারি কয়েকজন যুবক কুমিরমারী দিক থেকে খাদ্য আনতে গেলে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করার সময় তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে বহু মানুষ হতাহত হন বলে দাবি করা হয়। যদিও সরকারি নথিতে এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, তবুও মরিচঝাঁপি নিয়ে রচিত বহু গবেষণা, সাক্ষ্য ও স্মৃতিকথায় এই দিনটিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু অবরোধ, অনাহার, আতঙ্ক ও গুলিবর্ষণের পরও মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুরা দ্বীপ ছাড়েননি। তারা বেঁচে থাকার শেষ লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। আর ঠিক সেই কারণেই ১৯৭৯ সালের মে মাসে শুরু হয় আরও ভয়াবহ উচ্ছেদ অভিযান। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী, মানবাধিকারকর্মী ও পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত লেখালেখিতে দাবি করা হয়েছে, ১৩ মে গভীর রাত থেকে দ্বীপজুড়ে নৃশংস দমন অভিযান চালানো হয়। ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো হয়, বসতি ভেঙে ফেলা হয়, বহু মানুষকে মারধর, গুলি এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগও উঠে আসে বিভিন্ন বিবরণে। অনেকে আগুনে পুড়ে মারা যান, অনেকে পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে যান, অনেকে নিখোঁজ হয়ে যান। সেই রাতের বর্ণনা বহু মানুষের কাছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন, যা স্বাধীনোত্তর ভারতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

মরিচঝাঁপি গণহত্যায় প্রকৃত কত মানুষ নিহত হয়েছিলেন, তার সুনির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত সংখ্যা আজও অজানা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও মানবাধিকারভিত্তিক বিবরণে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত অনাহার, চিকিৎসার অভাব, গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিছু বিবরণে দাবি করা হয়, অবরোধকালীন অনাহারে ৯৪ জন এবং চিকিৎসাহীনতায় ১৭৭ জন শিশুর মৃত্যু ঘটে। আবার কোথাও বলা হয়েছে, সরাসরি সহিংসতায় অন্তত ২৩৯ জন নিহত এবং ১২৮ জন নিখোঁজ হন। ধর্ষণের শিকার হন বহু নারী। তবে এই সংখ্যাগুলোর সরকারি যাচাই আজও হয়নি। কারণ, এই ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ সরকারি তদন্ত হয়নি—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরেই ইতিহাসবিদ, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়ে আসছে। ফলে মরিচঝাঁপি আজও শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং ইতিহাসের এমন এক ক্ষত, যার গভীরতা অনুমান করা যায়, কিন্তু সম্পূর্ণ মাপা যায় না।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—যারা পূর্ব বাংলার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নোয়াখালী ও খুলনার দাঙ্গা, ১৯৭১-এর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা এবং দীর্ঘ উদ্বাস্তু জীবনের দুঃসহ স্মৃতি বয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারাই আবার নিজেদের তথাকথিত আশ্রয়স্থলে দ্বিতীয়বার নির্মমতার শিকার হলেন। যাদের কাছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল নিরাপত্তার আশ্বাস, তাদের জন্য সেই প্রতিশ্রুতিই হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের এক ভয়ংকর প্রতারণা। মরিচঝাঁপি তাই কেবল একটি উচ্ছেদ অভিযান নয়; এটি উদ্বাস্তু বাঙালি হিন্দুদের বেঁচে থাকার আকুতি, রাষ্ট্রীয় অবহেলা, রাজনৈতিক প্রতারণা এবং ক্ষমতার নির্মম প্রয়োগের এক অমোচনীয় দলিল।

বাংলা সাহিত্য, স্মৃতিকথা ও জনমানসে মরিচঝাঁপি আজও বেঁচে আছে। বহু লেখক, কবি ও গবেষকের কলমে এই ঘটনার উল্লেখ এসেছে। ইতিহাসের মূলধারায় দীর্ঘদিন প্রান্তিক হয়ে থাকলেও, মরিচঝাঁপি নিয়ে প্রশ্ন কখনও মুছে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জোরালো হয়েছে সেই দাবি—এই ঘটনার পূর্ণ সত্য উন্মোচন হোক, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা সামনে আসুক, এবং উদ্বাস্তুদের উপর সংঘটিত এই নির্মম অধ্যায় যথাযথভাবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হোক।

মরিচঝাঁপি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দেশভাগের ক্ষত শুধু সীমান্ত টেনে শেষ হয়নি; সেই ক্ষত বহন করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। উদ্বাস্তুদের কাছে রাষ্ট্র, রাজনীতি, মতাদর্শ বা ক্ষমতার ভাষণ নয়—সবচেয়ে বড় সত্য ছিল বেঁচে থাকার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের ইতিহাসে মরিচঝাঁপি এক রক্তাক্ত, বেদনাময় এবং কখনও ভোলা না যাওয়ার মতো নাম।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
মরিচঝাঁপি গণহত্যা: পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনামলে হিন্দু উদ্বাস্তুর রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর ইতিহাস
0:00 0:00
1.0x