আবিষ্কার:
দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত সীতাকোট বৌদ্ধবিহার ১৯৬৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার উদ্যোগে খননের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়।
খনন কার্যক্রমে সহায়তা করে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং জেলা পরিষদ।
পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সালে পুনরায় খনন পরিচালিত হয়।
নির্মাণকাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, বিহারটি খ্রিস্টীয় পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত।
এটি বাংলাদেশের আবিষ্কৃত প্রাচীনতম বৌদ্ধ বিহারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ও শিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য:
বিহারটি প্রায় বর্গাকৃতির, যার পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৬৫.২৩ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৬৪.১১ মিটার বিস্তৃত।
চারদিকে মোট ৪১টি ভিক্ষুকক্ষ নির্মিত, যেখানে উত্তর পাশে ৮টি এবং অন্যান্য তিন পাশে ১১টি করে কক্ষ রয়েছে।
প্রতিটি কক্ষের আকার প্রায় সমান এবং পেছনের দেয়ালে কুলুঙ্গি রয়েছে।
দেয়ালগুলো পুরু হওয়ায় নির্মাণশৈলীর দৃঢ়তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
অভ্যন্তরীণ কাঠামো:
বিহারের ভেতরে প্রায় ২.৫৯ মিটার প্রশস্ত একটি টানা বারান্দা রয়েছে, যা সব কক্ষকে সংযুক্ত করে।
বারান্দা ও অঙ্গিনার মাঝে একটি প্রাচীর থাকায় অভ্যন্তরীণ অংশ আড়াল করা থাকতো।
কক্ষগুলোর দরজা বারান্দার সাথে সংযুক্ত ছিল।
উপাসনালয় ও বিশেষ কক্ষ:
পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশের কেন্দ্রীয় কক্ষগুলো আকারে বড় এবং সেখানে ইটের বেদী পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ পাশের কেন্দ্রীয় কক্ষটিকে প্রধান মন্দির হিসেবে ধরা হয়।
মন্দিরের সামনে স্তম্ভযুক্ত অংশ ছিল, যা মণ্ডপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য:
এই বিহারে কোনো কেন্দ্রীয় স্তূপ বা মন্দির নেই।
এই কারণে এটি পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং শালবন বিহার এর তুলনায় ভিন্ন।
এটি একটি প্রাথমিক পর্যায়ের আবাসিক বৌদ্ধ মঠ হিসেবে বিবেচিত।
স্যানিটেশন ব্যবস্থা:
বিহারের দক্ষিণ দিকে পাঁচটি কক্ষবিশিষ্ট একটি অংশ পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, এগুলো শৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এটি প্রাচীন সময়ের উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার প্রমাণ।
প্রত্ননিদর্শন:
খননে ব্রোঞ্জ নির্মিত বোধিসত্ত্ব পদ্মাপাণি এবং মঞ্জুশ্রী মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে।
মূর্তিগুলো ৭ম থেকে ৮ম শতাব্দীর শিল্পধারার বলে ধারণা করা হয়।
উদ্ধারকৃত প্রত্নবস্তু বর্তমানে দিনাজপুর জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব:
এখানে পোড়ামাটির ফলক অনুপস্থিত, যা পরবর্তী বিহারগুলোর তুলনায় এর প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে।
স্থাপত্য বিন্যাস থেকে বোঝা যায়, এটি একটি সংগঠিত আবাসিক শিক্ষা কেন্দ্র ছিল।
বাংলাদেশের প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য ও সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মতামত