সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সব ধরনের পেশায় কাজ করতে অনাগ্রহ এবং চট্টগ্রামে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশমুখী মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে।
বদলে গেছে জনশক্তি রপ্তানির মানচিত্র
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায় শীর্ষে ছিল চট্টগ্রাম জেলা। পরবর্তীতে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর ধীরে ধীরে জনশক্তি রপ্তানিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে।
বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা নিম্নমুখী হতে শুরু করে।
ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম (ওইপি)-এর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন ৮৭ হাজার ৫২৪ জন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে গেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৮৪ হাজার ৯২৪ জন।
বছরভিত্তিক হিসাবেও চট্টগ্রামের তুলনায় অন্য জেলার অগ্রগতি স্পষ্ট। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে গেছেন ৩৮ হাজার ১৬২ জন, যেখানে কুমিল্লা থেকে গেছেন ৭৩ হাজার ৭৩৩ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৯ হাজার ৯২৭ জন। ২০২৫ সালেও একই ধারা অব্যাহত ছিল।
নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) উপ-পরিচালক (প্রশাসন) জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, বিশ্বের ১৭৬টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী গেলেও চট্টগ্রামের অধিকাংশ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশকেই পছন্দ করেন।
তার ভাষায়, “চট্টগ্রামের লোকজন মূলত ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যেতে আগ্রহী। দীর্ঘদিন ধরে এসব দেশে চট্টগ্রামের মানুষের ব্যবসায়িক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে নতুন কর্মীরাও পরিচিত পরিবেশ খোঁজেন।”
তিনি জানান, ওমানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় ৬০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা প্রক্রিয়া সীমিত হওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে বিদেশযাত্রাও কমে গেছে।
‘নিজ এলাকার মানুষ যেখানে বেশি, সেখানেই আগ্রহ’
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, “চট্টগ্রামের মানুষ সাধারণত সেই দেশগুলোতেই যেতে চান, যেখানে তাদের এলাকার লোকজন বেশি রয়েছে। অন্য জেলার মানুষ কাজের প্রয়োজনে নতুন নতুন দেশে যেতে আগ্রহী হলেও চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা তুলনামূলক কম।”
তার মতে, এই মানসিকতার কারণে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বহুমুখী সুযোগ গ্রহণে চট্টগ্রামের কর্মীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
সব ধরনের কাজে আগ্রহ কম
বিদেশগামী কর্মী নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের অনেক মানুষ শ্রমঘন বা স্বল্প আয়ের কাজে আগ্রহী নন। তারা মূলত ব্যবসা কিংবা ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগকে প্রাধান্য দেন।
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (অ্যাটাব) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবু জাফর বলেন, “চট্টগ্রামের মানুষ বিদেশে গিয়ে ব্যবসা কিংবা ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হতে চান। অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় তারা ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ফলে সাধারণ শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।”
স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়েছে। এর ফলে অনেকেই এখন বিদেশমুখী হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছেন না।
জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, “চট্টগ্রামে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একজন কর্মী চাইলে এক খাত থেকে অন্য খাতে সহজে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার চাপ আগের তুলনায় কমেছে।”
একই মত দেন আবু জাফর। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে আয়ের বিভিন্ন উৎস রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে যে আয় করা সম্ভব, স্থানীয়ভাবেও তার কাছাকাছি আয় করা যাচ্ছে। ফলে বিদেশগামী মানুষের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কমছে।
নতুন বাস্তবতায় করণীয়
সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামকে আবারও জনশক্তি রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হলে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বহুমুখী পেশায় কর্মীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রচলিত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শ্রমবাজারে প্রবেশের উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে জনশক্তি রপ্তানিতে চট্টগ্রাম আবারও হারানো অবস্থান ফিরে পেতে পারে।
মতামত