কুষ্টিয়ার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক এবং চিতা ও সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মীমাংসা প্রক্রিয়া নিয়ে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশের অভিযোগ, ধর্মীয় স্থানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার মতো গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক চাপের মুখে বিষয়টি গোপনে আপসের মাধ্যমে শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্ট, কুষ্টিয়া জেলা শাখা এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘অপ্রীতিকর’ উল্লেখ করে জানায়, সংশ্লিষ্টরা না বুঝে এ কাজ করেছেন বলে মতামত ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, কল্যাণ ফ্রন্ট এবং সনাতন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিষয়টির ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ’ মীমাংসা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়
তবে এই মীমাংসার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের প্রশ্ন, এত স্পর্শকাতর একটি ধর্মীয় স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনার ক্ষেত্রে যদি সত্যিই আপস হয়ে থাকে, তাহলে সেই আপসের লিখিত নথি, সংশ্লিষ্টদের প্রকাশ্য ক্ষমা চাওয়া কিংবা মীমাংসার অন্যান্য প্রমাণ কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না?
আরও প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনার প্রতিবাদকারী এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো ব্যক্তিদের ‘কুচক্রী মহল’ হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টি নিয়েও।
কল্যাণ ফ্রন্টের ২৭ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কিছু কুচক্রী মহল’ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটি এ ধরনের প্রচারণা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা রক্ষার দাবি জানানো এবং ঘটনার তদন্ত চাওয়াকে ‘সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা’ হিসেবে চিহ্নিত করা মূল ঘটনার দায় নির্ধারণের বদলে প্রতিবাদকারীদের ওপর চাপ তৈরির শামিল। তাঁদের মতে, কোনো ধর্মীয় স্থানে গুরুতর অনিয়ম বা অবমাননার অভিযোগ উঠলে তা প্রকাশ্যে তদন্ত করা এবং সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার স্বাভাবিক পথ।
কী ঘটেছিল হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের হরিনারায়ণপুর বাজার মহাশ্মশানে একদল যুবকের মাংস রান্না করে পিকনিক করার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে গরুর মাংস রান্না করা হয়েছিল। একই সঙ্গে শ্মশানের চিতা ও মৃত ব্যক্তির সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কয়েকজন যুবককে শ্মশান এলাকায় মাংস রান্না ও খেতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। কয়েকটি ছবিতে চিতা ও সমাধির ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলার দৃশ্যও দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়। এ বিষয়ে প্রকাশিত একাধিক স্থানীয় প্রতিবেদনে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে থাকা কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে শনাক্তও করা হয়েছে। তাঁদের বাড়ি হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের আব্দালপুর ও শান্তিডাঙ্গা এলাকায় বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, কোনো ধর্মের পবিত্র স্থানেই এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়। একই সঙ্গে তাঁরা ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চান না। তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করে আইনের আওতায় আনা হোক।
তদন্তের বদলে আপস কেন?
ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি আপসের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
এমনকি প্রকাশিত স্থানীয় প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করা নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য বিপুল কুমার সাহাকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বক্কর নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি এস এম মামুনুর রশীদের বক্তব্যও এসেছে। তিনি ঘটনাস্থলে মীমাংসার সময় উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, শ্মশান কমিটির নেতাদের থানায় আসতে বলা হয়েছে এবং তাঁরা এলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থাৎ পুলিশের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের দাবির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফলে ঘটনাটি আসলে কীভাবে মীমাংসার পর্যায়ে গেল এবং সেখানে কারা কী ভূমিকা রেখেছেন, তা স্পষ্ট করতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন।
‘কুচক্রী মহল’ বলায় নতুন প্রশ্ন
ঘটনার প্রতিবাদকারীদের ‘কুচক্রী মহল’ হিসেবে উল্লেখ করাই এখন স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা রক্ষার দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি ব্যবস্থা চাওয়া যদি ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নষ্টের প্রচারণা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ কোনো অনিয়মের প্রতিবাদ করতে কতটা নিরাপদ বোধ করবেন, সেই প্রশ্নও উঠছে।
বিশেষ করে কোনো ধর্মীয় স্থানে অবমাননার অভিযোগ উঠলে সেটি ধামাচাপা দেওয়া বা দ্রুত আপস করে ফেলার পরিবর্তে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা সম্ভব।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা করার চেষ্টা করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালনকারী কোনো সংগঠনের ভূমিকা রাজনৈতিক সমীকরণের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত।
ধর্মীয় স্থানের নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে দাবি
স্থানীয়দের দাবি, হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে এর আগেও সমাধি ভাঙচুর এবং মাংসের হাড়গোড় বা রান্নার আলামত পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে আগের এসব ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁদের ভাষ্য।
এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। ফলে স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, এবার ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত
বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের উদ্দেশ্য বা এমন জ্ঞান থাকা অবস্থায় উপাসনালয়, সমাধিস্থল, শেষকৃত্যের স্থান বা মৃতদেহের অবশেষ সংরক্ষিত স্থানে অনধিকার প্রবেশ, মৃতদেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণ কিংবা শেষকৃত্যে বিঘ্ন ঘটানোর মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় ঠিক কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ওপর।
হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুবাস কর্মকার বলেছেন, ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা রক্ষা সবার দায়িত্ব এবং ঘটনাটি দুঃখজনক। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাপস কুমার সাহাও ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্বীকার করে এটিকে দুঃখজনক এবং আইনগতভাবে তদন্তের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেছেন।
সম্প্রীতির নামে আপস নয়, আইনের শাসনই সমাধান
কুষ্টিয়ার এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন শুধু শ্মশানে কী ঘটেছিল তা নয়, বরং এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সেটিও।
সংখ্যালঘু অধিকার কর্মীরা বলছেন, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার নামে কোনো ঘটনা গোপনে মীমাংসা করে ফেলা এবং যারা তদন্ত ও বিচার দাবি করছেন তাঁদের ‘কুচক্রী মহল’ হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ তাই অভিযোগকে চাপা দেওয়া নয়, বরং আইনের আওতায় স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা ধর্মীয় সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও নিশ্চিত করতে হবে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় যেন পুরো কোনো সম্প্রদায়ের ওপর না পড়ে এবং কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
মতামত