দেশজুড়ে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত হামলা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, মঠ-মন্দির, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কার কথা জানিয়ে সংগঠনটি অবিলম্বে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
শুক্রবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব ও মুখপাত্র পলাশ কান্তি দে। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ড. প্রভাস চন্দ্র রায়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এক মূর্তমান আতঙ্কে পরিণত হয়। অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয় উল্লেখ করে নেতারা বলেন, নির্বাচন এলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা যেন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। ভোটের আগে ও পরে হিন্দু ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশে হিন্দু নির্যাতনের এক ধরনের “মহোৎসব” শুরু হয়েছে। তথাকথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দুদের হত্যা, পুড়িয়ে মারা, জমি দখল, চাঁদাবাজি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা দিনের আলোতেই সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। অথচ প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা কোথাও দৃশ্যমান নয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, নির্বাচন ঘিরে অনেক এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়কে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট না দিলে দেশে থাকতে দেওয়া হবে না—এমন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে হিন্দু ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মনোবল হারাচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও সতর্ক করেন নেতারা।
স্বরস্বতী পূজা প্রসঙ্গেও ক্ষোভ প্রকাশ করে মহাজোট জানায়, আগামী ২৩ জানুয়ারি স্বরস্বতী পূজার দিনে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছে, যা হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। বিদ্যার দেবী স্বরস্বতীর পূজায় অংশ নেওয়া থেকে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করতেই পরিকল্পিতভাবে ওই দিনে পরীক্ষা রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। সংগঠনটি ওই দিনে পরীক্ষা না নেওয়ার জোর দাবি জানায়।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট জানায়, তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একাধিক প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে ও পরে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা, সেনা মোতায়েন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচার নিষিদ্ধ, ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ এবং সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের জন্য বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা গঠনের দাবি রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে সংগঠনের সভাপতি ড. প্রভাস চন্দ্র রায় বলেন, “আমরা চাই জাতীয় সংসদ নির্বাচন সকল সম্প্রদায়ের জন্য উৎসবমুখর ও ভয়হীন হোক। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হবে।” মুখপাত্র পলাশ কান্তি দে বলেন, “হিন্দু সম্প্রদায় কোনো বিশেষ সুবিধা চায় না, শুধু বেঁচে থাকার নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার চায়।”
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, যুব মহাজোট ও ছাত্র মহাজোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মতামত