চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পৌরসভার নাথপাড়া এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পুরোনো পারিবারিক সমাধিস্থল ভেঙে মাটি দিয়ে ভরাট করে দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে, বহু বছর ধরে পরিচিত এই পারিবারিক সমাধিস্থলটি জোরপূর্বক দখল করতে সমাধির চিহ্ন পর্যন্ত নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফটিকছড়ি পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নাথপাড়া এলাকায়, পুরাতন নিতাইর দোকানের সামনে অবস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পারিবারিক সমাধিস্থল সম্প্রতি কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি মাটি ভরাট করে দখলের চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভা যুবদলের এক নেতার নেতৃত্বে এই দখলচেষ্টা চালানো হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতা নুরুদ্দীন ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিনের পুরোনো এই সমাধিস্থলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সেখানে থাকা সমাধিগুলোর চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন।
ভুক্তভোগী বঙ্কিমচন্দ্র অভিযোগ করে বলেন, এই জায়গাটি তাদের পরিবারের পূর্বপুরুষদের চিরনিদ্রার স্থান। এখানে তাঁর ঠাকুরদাদা, ঠাকুরমা এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের সমাধি রয়েছে। বহু বছর ধরে এলাকাবাসীও এই স্থানটিকে হিন্দু পরিবারের পারিবারিক সমাধিস্থল হিসেবেই চিনে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি কিছু লোক সেখানে এসে জোরপূর্বক মাটি ফেলে সমাধিস্থল ভরাট করে দেয় এবং সমাধির অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করে।
বঙ্কিমচন্দ্র আরও জানান, অভিযুক্তরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পরিবারটি ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না। প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “ওরা ক্ষমতাশালী। আমরা কিছু বলতে পারছি না। আমরা খুব আতঙ্কে আছি। প্রতিবাদ করলে আমাদের উড়িয়ে দেওয়ার মতো হুমকি দেওয়া হচ্ছে।” এই অভিযোগে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, এটি কোনো সাধারণ জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নয়; বরং একটি সংখ্যালঘু পরিবারের বহু পুরোনো পারিবারিক সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক গুরুতর অনিয়ম। তাদের মতে, মৃত স্বজনদের সমাধি উপড়ে ফেলে মাটি দিয়ে ভরাট করা শুধু মানবিক মূল্যবোধের চরম লঙ্ঘনই নয়, এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারের ওপরও সরাসরি আঘাত।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে। পরে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ফটিকছড়ির মাননীয় সংসদ সদস্য সারোয়ার আলমগীর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তাঁর এই হস্তক্ষেপে ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা আশ্বস্ত হলেও, এখনও পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সংখ্যালঘু সমাজের নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দেয়। তারা অবিলম্বে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, দখলচেষ্টা বন্ধ, সমাধিস্থলের আগের অবস্থা পুনরুদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফটিকছড়ির নাথপাড়ার এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যের স্থানগুলো কতটা নিরাপদ? একটি পুরোনো পারিবারিক সমাধিস্থল, যেখানে বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেটি যদি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত ও কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে এই অভিযোগের তদন্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।
মতামত