তবে সহধর্মিণীর ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে শ্রীরামচন্দ্র লক্ষ্মণের সেই সাবধানবাণী উপেক্ষা করেই মৃগটির সন্ধানে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া করার পর বনের গভীরে শ্রীরামের অব্যর্থ বাণে মায়াবী মারীচ বিদ্ধ হয়। কিন্তু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে লঙ্কাপতির এই অনুচর তার শেষ চালটি চালতে ভুল করেনি। শ্রীরামের কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে সে এক আর্তনাদ ছড়িয়ে দেয় বনময়— “হা সীতা! হা লক্ষ্মণ!”
আশ্রম থেকে ভেসে আসা সেই ছলনাময় আর্তনাদ শুনে দেবী সীতা চরমভাবে বিচলিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি স্থির নিশ্চিত হন যে প্রভু রাম বড় কোনো বিপদে পড়েছেন। লক্ষ্মণ পরিস্থিতি বিচার করে দেবী সীতাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও এবং এটি যে রাক্ষসদের মায়া তা বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সীতার কঠোর বাক্যবাণে ও ব্যাকুলতায় বিচলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্মণ আশ্রম অরক্ষিত রেখেই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সন্ধানে যেতে বাধ্য হন।
পরিতাপের বিষয় হলো, মারীচের এই আত্মত্যাগ ও ছলনা যে এক বৃহত্তর সর্বনাশের মহড়া ছিল, তা মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রক্ষাকর্তাহীন আশ্রমে সীতাকে একাকী পেয়ে দশানন রাবণ তার হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করে। পঞ্চবটীর এই শূন্যতা আজ কেবল একটি আশ্রমের একাকীত্ব নয়, বরং সমগ্র আর্যাবর্তের জন্য এক আসন্ন মহাযুদ্ধের পূর্বাভাস দিচ্ছে। মায়ার পেছনে ছুটে গিয়ে যে সত্য আজ আড়ালে পড়ল, তার চড়া মূল্য দিতে হবে সমগ্র সমাজ ও সংস্কৃতিকে। ভবিতব্যের এই লিখন আজ অরণ্যের পাতায় পাতায় এক শোকাতুর দীর্ঘশ্বাস হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মতামত