হিন্দুস নিউজ

বসন্তের বিদায়ী লগ্নে দেবী বিসর্জন: বাসন্তী দশমীর মাহাত্ম্য ও অঙ্গীকার


| প্রিন্ট সংস্করণ

বসন্তের বিদায়ী লগ্নে দেবী বিসর্জন: বাসন্তী দশমীর মাহাত্ম্য ও অঙ্গীকার
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
আজ ২৮ মার্চ, প্রকৃতিতে বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসের মাঝে বেজে উঠেছে বিদায়ের সুর। চৈত্র মাসের এই পুণ্য তিথিতে বাসন্তী দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমী উদযাপিত হচ্ছে, যা বাঙালির আদি ও অকৃত্রিম দেবী আরাধনার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। ত্রেতা যুগে রাজা সুরথ বসন্তকালের এই সময়েই প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বলে একে বাসন্তী পূজা বলা হয়। মহিষাসুরমর্দিনীর এই অকালবোধন পরবর্তীকালে জনপ্রিয় হলেও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী চৈত্র মাসের এই শুক্লপক্ষই ছিল দেবী পূজার আদি লগ্ন। আজকের এই দশমী তিথি মূলত অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও ন্যায়ের জয়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।


​বিজয়া দশমীর শাস্ত্রীয় নিয়মের গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আধ্যাত্মিক চেতনার এক চূড়ান্ত প্রতিফলন। দশমীর সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীর বিদায় তর্পণ সম্পন্ন হয়, যেখানে ভক্তরা আয়নার প্রতিবিম্বে মায়ের পাদপদ্ম দর্শন করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এরপর চলে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা সধবা নারীদের পরম সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বিসর্জনের এই ক্ষণটি ভক্ত হৃদয়ে বিষাদ আনলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন। মা প্রতিমা রূপ ত্যাগ করে ভক্তের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গ্রহণ করেন এবং মর্ত্যলোক থেকে কৈলাসে ফিরে যান শান্তি ও সমৃদ্ধির আশিস দিয়ে।

​এই পূজার মাহাত্ম্য কেবল শাস্ত্রীয় বিধিতে সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। বাসন্তী পূজা আমাদের শেখায় যে ধৈর্য এবং ভক্তির মাধ্যমে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি জয় করা সম্ভব। রাজা সুরথ নিজের হৃত রাজ্য ফিরে পেতে এবং সমাধি বৈশ্য মানসিক শান্তি অর্জনে দেবীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। বর্তমান যুগেও আমাদের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে যখন অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন এই মহাশক্তির আরাধনা আমাদের আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য ধারণের শক্তি জোগায়। বিজয়া দশমীর কোলাকুলি ও প্রণাম বিনিময়ের রীতিটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

​মানব কল্যাণে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আজকের এই দিনটি এক বিশেষ বার্তা দেয়। বিজয়া দশমীর প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রকাশ পাবে, যখন আমরা অন্তরের কাম, ক্রোধ, লোভ ও অহংকার রূপী অসুরদের বিসর্জন দিতে পারব। মানবসেবাই যে প্রকৃত ঈশ্বর সেবা, এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আমাদের আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো উচিত। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের দুঃখ মোচন, পরিবেশ রক্ষা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া হলো আজকের দিনের শ্রেষ্ঠ সংকল্প। মা দুর্গা যেমন অশুভকে বিনাশ করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি আমাদেরও উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সমাজের মঙ্গলে নিজেকে উৎসর্গ করা। এই ত্যাগের মানসিকতা এবং পরোপকারই হতে পারে বাসন্তী পূজার প্রকৃত বিজয়া বার্তা।

Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।

​অবশেষে, "আসছে বছর আবার হবে" এই চিরন্তন আশার বাণী বুকে নিয়ে আমরা দেবীকে বিদায় জানাই। বিসর্জনের জলে প্রতিমা বিলীন হলেও দেবীর আদর্শ যেন আমাদের কর্ম ও চিন্তায় প্রবহমান থাকে। আজকের এই বিজয়া দশমী সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ, সুস্বাস্থ্য এবং সম্প্রীতির অটুট বন্ধন। সকলের কল্যাণ হোক, জগতের মঙ্গল হোক—এই প্রার্থনা নিয়ে সমাপ্ত হোক এই বছরের বাসন্তী দুর্গোৎসব।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বসন্তের বিদায়ী লগ্নে দেবী বিসর্জন: বাসন্তী দশমীর মাহাত্ম্য ও অঙ্গীকার

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মার্চ ২০২৬

featured Image
আজ ২৮ মার্চ, প্রকৃতিতে বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাসের মাঝে বেজে উঠেছে বিদায়ের সুর। চৈত্র মাসের এই পুণ্য তিথিতে বাসন্তী দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমী উদযাপিত হচ্ছে, যা বাঙালির আদি ও অকৃত্রিম দেবী আরাধনার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। ত্রেতা যুগে রাজা সুরথ বসন্তকালের এই সময়েই প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বলে একে বাসন্তী পূজা বলা হয়। মহিষাসুরমর্দিনীর এই অকালবোধন পরবর্তীকালে জনপ্রিয় হলেও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী চৈত্র মাসের এই শুক্লপক্ষই ছিল দেবী পূজার আদি লগ্ন। আজকের এই দশমী তিথি মূলত অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও ন্যায়ের জয়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।


​বিজয়া দশমীর শাস্ত্রীয় নিয়মের গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আধ্যাত্মিক চেতনার এক চূড়ান্ত প্রতিফলন। দশমীর সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীর বিদায় তর্পণ সম্পন্ন হয়, যেখানে ভক্তরা আয়নার প্রতিবিম্বে মায়ের পাদপদ্ম দর্শন করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এরপর চলে দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা সধবা নারীদের পরম সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বিসর্জনের এই ক্ষণটি ভক্ত হৃদয়ে বিষাদ আনলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন। মা প্রতিমা রূপ ত্যাগ করে ভক্তের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গ্রহণ করেন এবং মর্ত্যলোক থেকে কৈলাসে ফিরে যান শান্তি ও সমৃদ্ধির আশিস দিয়ে।

​এই পূজার মাহাত্ম্য কেবল শাস্ত্রীয় বিধিতে সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। বাসন্তী পূজা আমাদের শেখায় যে ধৈর্য এবং ভক্তির মাধ্যমে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি জয় করা সম্ভব। রাজা সুরথ নিজের হৃত রাজ্য ফিরে পেতে এবং সমাধি বৈশ্য মানসিক শান্তি অর্জনে দেবীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। বর্তমান যুগেও আমাদের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে যখন অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন এই মহাশক্তির আরাধনা আমাদের আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য ধারণের শক্তি জোগায়। বিজয়া দশমীর কোলাকুলি ও প্রণাম বিনিময়ের রীতিটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

​মানব কল্যাণে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আজকের এই দিনটি এক বিশেষ বার্তা দেয়। বিজয়া দশমীর প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রকাশ পাবে, যখন আমরা অন্তরের কাম, ক্রোধ, লোভ ও অহংকার রূপী অসুরদের বিসর্জন দিতে পারব। মানবসেবাই যে প্রকৃত ঈশ্বর সেবা, এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আমাদের আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো উচিত। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের দুঃখ মোচন, পরিবেশ রক্ষা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া হলো আজকের দিনের শ্রেষ্ঠ সংকল্প। মা দুর্গা যেমন অশুভকে বিনাশ করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি আমাদেরও উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সমাজের মঙ্গলে নিজেকে উৎসর্গ করা। এই ত্যাগের মানসিকতা এবং পরোপকারই হতে পারে বাসন্তী পূজার প্রকৃত বিজয়া বার্তা।

​অবশেষে, "আসছে বছর আবার হবে" এই চিরন্তন আশার বাণী বুকে নিয়ে আমরা দেবীকে বিদায় জানাই। বিসর্জনের জলে প্রতিমা বিলীন হলেও দেবীর আদর্শ যেন আমাদের কর্ম ও চিন্তায় প্রবহমান থাকে। আজকের এই বিজয়া দশমী সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ, সুস্বাস্থ্য এবং সম্প্রীতির অটুট বন্ধন। সকলের কল্যাণ হোক, জগতের মঙ্গল হোক—এই প্রার্থনা নিয়ে সমাপ্ত হোক এই বছরের বাসন্তী দুর্গোৎসব।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
বসন্তের বিদায়ী লগ্নে দেবী বিসর্জন: বাসন্তী দশমীর মাহাত্ম্য ও অঙ্গীকার
0:00 0:00
1.0x