১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাজুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা শুরু হলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি পরিচিত মুখ ‘মধুদা’ খ্যাত মধুসূদন দে হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে, স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাঙালিদের ওপর চালানো সেই বর্বরতার আগুন খুব দ্রুতই পৌঁছে যাবে তাঁর নিজের ঘরেও। আর সেই রাতের ভয়াবহতা চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিয়েছিল তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রঞ্জিত দে এবং নববধূ পুত্রবধূ রানি দে’র নবদাম্পত্য জীবনের সমস্ত স্বপ্ন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের ভোররাতে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয় মধুসূদন দে’র বাসভবনে। ঢাকার জগন্নাথ হল সংলগ্ন শিবমন্দিরের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া স্টাফ কোয়ার্টারে তখন পরিবারের সদস্যরা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে অবস্থান করছিলেন। ঘরে ছিলেন মধুসূদন দে, তাঁর স্ত্রী জগমায়া দেবী এবং তাঁদের সন্তানরা। পরিবারের দুই মেয়ে ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে, আর ছোট মেয়ে গিয়েছিলেন আত্মীয়ের বাড়িতে। কিন্তু সেই রাতে ঘরে থাকা সদস্যদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক বিভীষিকাময় পরিণতি।
পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানদের একজন, তখন মাত্র নয় বছরের অরুণ কুমার দে, আজও ভুলতে পারেননি সেই রাতের দৃশ্য। প্রার্থনার ঘরে ঢুকে তিনি দেখেন, তাঁর বড় ভাই রঞ্জিত দে মেঝেতে পড়ে আছেন। বুকের রক্তে ভেসে গেছে ঘর। শিশুমনেই তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর ভাই আর বেঁচে নেই। এরপর তাঁর চোখ যায় ভাবি রানি দে’র দিকে। লালচে শাড়ি পরে, মাথা ঢাকা অবস্থায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন তিনি। কোলে রাখা হাত, দৃষ্টি স্থির স্বামীর নিথর দেহের দিকে। কপালের সিঁদুর প্রায় মুছে গেছে। অরুণ বারবার ডাকলেও কোনো সাড়া মেলেনি। কাঁধে হাত দিতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রানি। তখনই প্রকাশ পায়, তাঁর দুই হাত রক্তে ভেজা, শাঁখা-পলা পরা কব্জি ও আঙুলের মাংস ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
এই দৃশ্যই অরুণের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে—এক নবদম্পতির রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি, যারা বিয়ের মাত্র সাত-আট মাসের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার শিকার হন।
রঞ্জিত দে ছিলেন মধুসূদন দে’র জ্যেষ্ঠ পুত্র। জগন্নাথ কলেজ থেকে বিকম পাস করে একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। মেধাবী ছাত্র হিসেবে যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনি খেলাধুলাতেও ছিলেন পারদর্শী—বিশেষ করে ব্যাডমিন্টনে। পরিবারে তিনি ছিলেন একাধারে বড় ভাই, অভিভাবক, শাসক এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক। ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনায় কঠোর নজর রাখতেন। গুরুগম্ভীর স্বভাবের হলেও তাঁর ভেতরে ছিল সাংস্কৃতিক এক অনন্য সত্তা। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি এবং দেশাত্মবোধক গান গাইতে ভালোবাসতেন তিনি।
অন্যদিকে, রানি দে ছিলেন শান্ত, কোমল, স্নিগ্ধ স্বভাবের এক গৃহবধূ। সদ্য বিয়ের পর বড় বউ হিসেবে তিনি সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। শ্বাশুড়ি জগমায়া দেবীকে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, ছোট দেবর-ননদদের সঙ্গে মিশতেন আপনজনের মতো। অরুণের স্মৃতিতে রানি দে কেবল শহীদ এক নারী নন, তিনি এক স্নেহময়ী বৌদি—যাঁর রান্না করা মুগডাল, বিশেষ করে মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা ডাল ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। কখনও লুডু খেলতেন, কখনও বসে দেখতেন ভাই ও ভাবির হাসি-ঠাট্টা। নবদাম্পত্যের ছোট ছোট আনন্দেই ভরে উঠছিল তাঁদের সংসার। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ সেই সংসারকে মুহূর্তেই শ্মশানে পরিণত করে।
ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এরপর তারা ওপরতলার কক্ষে ঢুকে মধুসূদন দে’কে বেঁধে ফেলে এবং তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী জগমায়া দেবী স্বামীকে রক্ষা করতে হাত তুলে এগিয়ে আসেন। হানাদাররা নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে তাঁর দুই হাত কুপিয়ে দেয়। এই দৃশ্যই পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার ভয়াবহতা প্রকাশ করে।
রানি দে তখন ছিলেন প্রার্থনার ঘরে। পাকিস্তানি সেনারা যখন তাঁর দিকে এগিয়ে যায়, ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন রঞ্জিত দে। তিনি স্ত্রীকে হাত তুলতে বলেন, হয়তো ভেবেছিলেন এতে তাঁকে রক্ষা করা যাবে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই পাকিস্তানি সেনারা রঞ্জিতের বুকে গুলি চালায়। তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। এরপর মধুসূদন দে’কেও গুলি করা হয় এবং আহত অবস্থায় তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ হলের মাঠে, যেখানে নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
রানি দে কীভাবে নিহত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে আজও পুরোপুরি নিশ্চিত তথ্য নেই। পরিবার প্রথমে ভেবেছিল তিনি বেঁচে আছেন। কিন্তু অরুণের স্পর্শে যখন তিনি পড়ে যান, তখনই স্পষ্ট হয়—সেও শহীদ হয়েছেন। অরুণের ধারণা, ভয়াবহ আতঙ্কে হয়তো তিনি গুটিয়ে বসে পড়েছিলেন, আর তখনই পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গুলি করে বা আঘাত করে হত্যা করে।
সেই রাতেই অরুণ ও তাঁর ভাইবোনেরা নিজের চোখের সামনে হারান তাঁদের বাবা, মা, বড় ভাই এবং সদ্য ঘরে আসা বড় ভাবিকে। পরদিন এক পরিচিতজনের সহায়তায় তাঁরা পালিয়ে যান মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে নিজেদের পৈতৃক ভিটায়। পরে সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। কিন্তু ঘরের ভেতরে পড়ে থাকে চারটি নিথর দেহ—মধুসূদন দে, জগমায়া দেবী, রঞ্জিত দে এবং রানি দে’র দেহ। কয়েকদিন ধরে সেগুলো সেখানেই পড়ে ছিল। পরবর্তীতে পৌরসভার কর্মীরা এসে পচে যাওয়া মরদেহ সরিয়ে নিয়ে যায়।
মতামত