ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে মিথিলা ও নবদ্বীপের জ্ঞানালোকিত ঐতিহ্য বহন করে শ্রী শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্য সপরিবারে এই নিভৃত অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি ছিলেন একাধারে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত এবং আদ্যাশক্তি মা ত্রিপুরা সুন্দরীর একনিষ্ঠ সাধক। সুচিয়া গ্রামে বসতি স্থাপনের পর তিনি সাধনার জন্য একটি বিশাল দীঘি খনন করেন এবং এর তীরে দেবী ত্রিপুরা সুন্দরীর মন্দির ও নিজের সাধন মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, এই মঠেই দেবী সশরীরে আবির্ভূত হয়ে সাধক শুক্লাম্বরকে সিদ্ধিফল প্রদান করেছিলেন। সেই থেকে এই স্থানটি সাধনপীঠ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।
এই পবিত্র দীঘিটি ঘিরে রয়েছে বিস্ময়কর সব অলৌকিক কাহিনী। শত বছরের ইতিহাস সাক্ষী, প্রলয়ঙ্করী শঙ্খনদীর প্লাবন কখনো এই দীঘির পবিত্র জলকে স্পর্শ করতে পারেনি। কিংবদন্তি রয়েছে, একবার বর্ষায় শঙ্খনদীর জল দীঘি অপবিত্র করতে উদ্যত হলে শ্রী শুক্লাম্বর তাঁর কমন্ডলুর জল ছিটিয়ে নদীকে শান্ত করেন এবং এক মৃত গরুকে জীবনদান করেন। তখন স্বয়ং মকরবাহিনী গঙ্গা আবির্ভূত হয়ে বর দিয়েছিলেন যে, এই দীঘির পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। সেই স্মৃতি আজও দীঘির পাড়ের একটি বিশেষ অংশে অম্লান হয়ে আছে, যা শত চেষ্টার পরেও কখনো সমান করা যায়নি। এছাড়া উত্তরায়ণ সংক্রান্তিতে এই দীঘিতে স্নান করলে গঙ্গাস্নানের তুল্য পুণ্য লাভ হয় বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন।
বর্তমানে শ্রী শুক্লাম্বর ভট্টাচার্য্যের বংশধরেরাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তাল সময়েও এখানে নিত্যপূজা বন্ধ হয়নি। প্রতি বছর উত্তরায়ণ সংক্রান্তি উপলক্ষে এখানে বিশাল মেলা বসে এবং দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। শ্রী শুক্লাম্বর কোনো সমাধি রেখে যাননি, তবে ভক্তদের বিশ্বাস—এই পবিত্র চত্বরের প্রতিটি ধূলিকণায় আজও মহাপুরুষের চরণচিহ্ন বিদ্যমান। যারা পার্থিব দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি চান এবং শুদ্ধ মনে দেবীর কৃপা প্রার্থনা করেন, তাঁদের কাছে এই শুক্লাম্বর দীঘি এক অনন্ত প্রশান্তির নাম।
মতামত