হিন্দুস নিউজ

পঞ্চভূতের দেহ পঞ্চভূতেই বিলীন: মৃতদেহ দাফন নয়, শাশ্বত বিজ্ঞানের নিরিখে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াই মৃতদেহের সর্বোত্তম সৎকার


| প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চভূতের দেহ পঞ্চভূতেই বিলীন: মৃতদেহ দাফন নয়, শাশ্বত বিজ্ঞানের নিরিখে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াই মৃতদেহের সর্বোত্তম সৎকার
Hindus News Voice of Hinduism
আপনার পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন Hindus News এ।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ নামক একটি পেজ থেকে মৃতদেহ সৎকার নিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর পোস্ট করা হয়েছে, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় বিজ্ঞানের পরিপন্থী। জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক টকশো ‘স্টারটক’-এর একটি পর্বের উদাহরণ টেনে সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, মৃতদেহ দাহ করার চেয়ে মাটিতে দাফন করা বেশি অর্থবহ। বিজ্ঞানপ্রিয়র ওই পোস্টে বলা হয়, দাফন করলে শরীর ধীরে ধীরে মাটির অণুজীব ও বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যে পরিণত হয়ে প্রকৃতির জৈবচক্রে ফিরে যায়। অন্যদিকে, দাহ বা ক্রিমেশন করলে দেহের শক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়ে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে দাফন প্রক্রিয়াকে পরিবেশবান্ধব প্রমাণের এই একপাক্ষিক প্রচেষ্টা সনাতনীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।


​প্রকৃতপক্ষে, সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় প্রমাণ ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান অনুযায়ী মৃতদেহ দাহ করাই সর্বোত্তম ও সবচেয়ে অর্থবহ সৎকার পদ্ধতি। পবিত্র যজুর্বেদের (৪০।১৫) মন্ত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— "বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্", অর্থাৎ প্রাণ বায়ুর সাথে মিশে যাক এবং এই ভৌতিক শরীর ভস্মে পরিণত হোক। সনাতন শাস্ত্র মতে, মানুষের শরীর ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—এই পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত। মৃত্যুর পর এই নশ্বর দেহকে পুনরায় প্রকৃতির সেই মূল উপাদানে দ্রুততম সময়ে ফিরিয়ে দেওয়াই হলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। মাটির নিচে দেহকে পচিয়ে ফেলার চেয়ে অগ্নির মাধ্যমে দেহকে পবিত্র করা অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত, কারণ অগ্নি একমাত্র উপাদান যা সমস্ত অশুচিতাকে পুড়িয়ে বস্তুকে বিশুদ্ধ করতে সক্ষম, ঠিক যেমন স্বর্ণ অগ্নির সংস্পর্শে বিশুদ্ধ হয়।

​শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২২ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জ্ঞান দান করেছেন যে, মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি পুরনো দেহ ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে। এই অবিনশ্বর দর্শনের আলোকে মৃতদেহ কেবল একটি ত্যাজ্য পোশাক মাত্র। একে দাহ না করলে তা পচে পরিবেশে দুর্গন্ধ ও জীবাণু সৃষ্টি করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অন্যদিকে, দাহ করার মাধ্যমে দেহ মুহূর্তেই প্রকৃতির মূল উপাদানে মিশে যায়। উপনিষদে (বৃহদারণ্যক ৫।১১।১) মৃতদেহ অগ্নিতে সৎকার করাকে ‘পরম তপস্যা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এমনকি ন্যায়সূত্রে (৩।১।৪) উল্লেখ আছে যে, শরীর থেকে আত্মা ত্যাগ করার পর তাকে দাহ করলে কোনো পাপ হয় না।

​মনুসংহিতার বিধান অনুযায়ী, মানুষের জীবনের ষোলোটি সংস্কারের মধ্যে সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হলো এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা ‘নরমেধ যজ্ঞ’। সমাজে প্রচলিত মৃতদেহ স্পর্শ করলে বা দাহ করলে পাপ হয়—এমন ধারণা সম্পূর্ণ কুসংস্কার। মূলত দাহকার্যের সময় শরীরে ছাই বা ময়লা লাগার সম্ভাবনা থাকে বলেই পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে স্নান করার নিয়ম প্রচলিত। সুতরাং, তথাকথিত পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে হাজার বছরের ঋষি-মুনিদের নির্দেশিত এই অগ্নিশুদ্ধি প্রক্রিয়াই যে আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও প্রশ্নাতীত, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

হিন্দুস নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পঞ্চভূতের দেহ পঞ্চভূতেই বিলীন: মৃতদেহ দাফন নয়, শাশ্বত বিজ্ঞানের নিরিখে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াই মৃতদেহের সর্বোত্তম সৎকার

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মে ২০২৬

featured Image
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ নামক একটি পেজ থেকে মৃতদেহ সৎকার নিয়ে একটি বিভ্রান্তিকর পোস্ট করা হয়েছে, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় বিজ্ঞানের পরিপন্থী। জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক টকশো ‘স্টারটক’-এর একটি পর্বের উদাহরণ টেনে সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, মৃতদেহ দাহ করার চেয়ে মাটিতে দাফন করা বেশি অর্থবহ। বিজ্ঞানপ্রিয়র ওই পোস্টে বলা হয়, দাফন করলে শরীর ধীরে ধীরে মাটির অণুজীব ও বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যে পরিণত হয়ে প্রকৃতির জৈবচক্রে ফিরে যায়। অন্যদিকে, দাহ বা ক্রিমেশন করলে দেহের শক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়ে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে দাফন প্রক্রিয়াকে পরিবেশবান্ধব প্রমাণের এই একপাক্ষিক প্রচেষ্টা সনাতনীদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।


​প্রকৃতপক্ষে, সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় প্রমাণ ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান অনুযায়ী মৃতদেহ দাহ করাই সর্বোত্তম ও সবচেয়ে অর্থবহ সৎকার পদ্ধতি। পবিত্র যজুর্বেদের (৪০।১৫) মন্ত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— "বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্", অর্থাৎ প্রাণ বায়ুর সাথে মিশে যাক এবং এই ভৌতিক শরীর ভস্মে পরিণত হোক। সনাতন শাস্ত্র মতে, মানুষের শরীর ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—এই পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত। মৃত্যুর পর এই নশ্বর দেহকে পুনরায় প্রকৃতির সেই মূল উপাদানে দ্রুততম সময়ে ফিরিয়ে দেওয়াই হলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য। মাটির নিচে দেহকে পচিয়ে ফেলার চেয়ে অগ্নির মাধ্যমে দেহকে পবিত্র করা অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত, কারণ অগ্নি একমাত্র উপাদান যা সমস্ত অশুচিতাকে পুড়িয়ে বস্তুকে বিশুদ্ধ করতে সক্ষম, ঠিক যেমন স্বর্ণ অগ্নির সংস্পর্শে বিশুদ্ধ হয়।

​শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২২ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জ্ঞান দান করেছেন যে, মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি পুরনো দেহ ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে। এই অবিনশ্বর দর্শনের আলোকে মৃতদেহ কেবল একটি ত্যাজ্য পোশাক মাত্র। একে দাহ না করলে তা পচে পরিবেশে দুর্গন্ধ ও জীবাণু সৃষ্টি করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অন্যদিকে, দাহ করার মাধ্যমে দেহ মুহূর্তেই প্রকৃতির মূল উপাদানে মিশে যায়। উপনিষদে (বৃহদারণ্যক ৫।১১।১) মৃতদেহ অগ্নিতে সৎকার করাকে ‘পরম তপস্যা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এমনকি ন্যায়সূত্রে (৩।১।৪) উল্লেখ আছে যে, শরীর থেকে আত্মা ত্যাগ করার পর তাকে দাহ করলে কোনো পাপ হয় না।

​মনুসংহিতার বিধান অনুযায়ী, মানুষের জীবনের ষোলোটি সংস্কারের মধ্যে সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হলো এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা ‘নরমেধ যজ্ঞ’। সমাজে প্রচলিত মৃতদেহ স্পর্শ করলে বা দাহ করলে পাপ হয়—এমন ধারণা সম্পূর্ণ কুসংস্কার। মূলত দাহকার্যের সময় শরীরে ছাই বা ময়লা লাগার সম্ভাবনা থাকে বলেই পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে স্নান করার নিয়ম প্রচলিত। সুতরাং, তথাকথিত পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে হাজার বছরের ঋষি-মুনিদের নির্দেশিত এই অগ্নিশুদ্ধি প্রক্রিয়াই যে আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও প্রশ্নাতীত, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।


হিন্দুস নিউজ

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে
HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত

প্রকাশক & সম্পাদক: শুভ চন্দ্র দে,🔴HINDUS NEWS মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রকাশিত।🔴যোগাযোগ: +88 01890890920🔴 ই-মেইল: news@hindus.news 🔴 বিজ্ঞাপন: ads@hindus.news
পঞ্চভূতের দেহ পঞ্চভূতেই বিলীন: মৃতদেহ দাফন নয়, শাশ্বত বিজ্ঞানের নিরিখে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াই মৃতদেহের সর্বোত্তম সৎকার
0:00 0:00
1.0x