তৃণমূলের মাটি থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতির মূল মঞ্চে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা নেতৃত্বের সংখ্যা আমাদের ইতিহাসে খুব বেশি নয়। তেমনই এক বর্ণাঢ্য, ব্যতিক্রমী ও অবিসংবাদিত জননেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ভাটি অঞ্চলের হাওর-বেষ্টিত প্রত্যন্ত জনপদ থেকে যাত্রা শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণেতাদের একজন হয়ে ওঠার ইতিহাস কোনো সাধারণ গল্প নয়, বরং কঠোর সংগ্রাম ও মেধার এক অনন্য আখ্যান।
ছোটবেলায় আর দশটা দুরন্ত কিশোরের মতোই চঞ্চল ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। পড়াশোনায় মনোযোগ না থাকায় মাধ্যমিক পরীক্ষায় একাধিকবার ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়েছিল তাঁকে। নাটকের মঞ্চ ও যাত্রাপালার প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। কিন্তু এই বাহ্যিক ব্যর্থতা ও দুরন্তপনাই যে তাঁর জীবনের শেষ কথা ছিল না, তা তিনি প্রমাণ করেছেন পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আইনজীবী হিসেবে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং দ্রুতই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) হয়ে প্রসূতি স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর যে পদচারণা শুরু হয়েছিল, তা স্বাধীনতার পর আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেওয়া এই নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র রচনায় যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা তাঁকে দেশের সনাতনী সম্প্রদায়সহ সমগ্র দেশবাসীর কাছে এক উজ্জ্বল ও চিরস্মরণীয় আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তাঁকে ‘ছোট দলের বড় নেতা’ হিসেবে অভিহিত করাটাই সমীচীন। সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই জননেতা আইন ও সংসদীয় বিষয়ে যে পরিমাণ বুৎপত্তি প্রদর্শন করেছিলেন, তা বিরল। তাঁর তীক্ষ্ণ যুক্তি, ক্ষুরধার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অনুপম রসবোধের কারণে জাতীয় সংসদে তাঁর বক্তব্য শুনতে প্রতিপক্ষ দলের সদস্যরাও সাগ্রহে অপেক্ষা করতেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই হোক কিংবা হাওরাঞ্চলের ‘সেনদা’ বা ‘দুখু সেন’ হিসেবে সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর সময়েই হোক—সুবাস্তব ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি আমরণ লালন করেছেন। রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য ও বিতর্কের আলো-ছায়া থাকলেও, নিজ ভূখণ্ড ও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল প্রশ্নাতীত। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণের তিরোধানের পর তাঁর জন্মভূমি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের আনোয়ারপুরে নিজ হাতে রোপণ করা চন্দনগাছের কাঠে সম্পন্ন হয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। হাওরের কাদা-জল থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করা এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রমাণ করে গেছেন, ব্যর্থতা জীবনের শেষ কথা নয়—বরং প্রগতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধই একজন মানুষকে ইতিহাসে অমর করে রাখে।
মতামত