উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনার প্রস্তাব বাতিল হওয়ার এই ঘটনাকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে, দিল্লিতে ইউএই নেতার স্বল্প সময়ের যাত্রাবিরতির পরপরই এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে।
পাকিস্তানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নেওয়ার বিষয়ে পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আলোচনা চলছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রাথমিকভাবে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্প থেকে সরে আসে ইউএই। পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’ জানিয়েছে, স্থানীয় কোনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার না পাওয়াকে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণও সক্রিয় থাকতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ইয়েমেন সংকটসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ঠিক একই সময়ে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করছে এবং তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে একটি যৌথ সামরিক জোট গঠনের আলোচনা চলছে বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এক পক্ষের ওপর আক্রমণকে অন্য পক্ষের ওপর আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিন্ন কৌশলগত পথে হাঁটছে। চলতি মাসে ইউএই প্রেসিডেন্টের দিল্লি সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের লক্ষ্যে একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ স্বাক্ষরকে স্বাগত জানানো হয়। এই পদক্ষেপ ভারত-ইউএই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
একসময় পাকিস্তানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে কর্মরত হাজার হাজার পাকিস্তানি শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স পাকিস্তানের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বিনিয়োগ খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা ছিল দৃঢ়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্পর্কে ভাটা পড়ে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পাকিস্তানের বহু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়েছে এবং সেগুলো নামমাত্র মূল্যে বেসরকারি খাতে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর পরিচালনায় অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ইউএইয়ের ইসলামাবাদ বিমানবন্দর প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোকে পাকিস্তানের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর বিপরীতে, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক দিন দিন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সম্প্রতি দিল্লি সফরের পর ইউএই কর্তৃপক্ষ ৯০০ ভারতীয় বন্দিকে মুক্তির অনুমোদন দেয়, যা নয়াদিল্লির প্রতি সদিচ্ছার একটি বড় বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেন এবং ভারত-ইউএই ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও উচ্চাভিলাষী ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে একমত হন।
বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক সমন্বয়ের একটি রোডম্যাপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হওয়ার ঘোষণা, যা দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে
মতামত