সিলেটের লোকজ সংস্কৃতির অঙ্গনে নেমে এলো গভীর শোক। ধামাইল গানসহ বিলুপ্তপ্রায় সিলেটি লোকসঙ্গীত সংরক্ষণে আজীবন নিবেদিত সাধক,গবেষক ও সংগ্রাহক রামকৃষ্ণ সরকার আর নেই। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। তিনি স্ত্রী,এক পুত্র এবং অসংখ্য শিষ্য ও সংগীতানুরাগী রেখে গেছেন।
রামকৃষ্ণ সরকারের প্রয়াণে সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। ধামাইল গান ও নৃত্য সংরক্ষণ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বজনস্বীকৃত এক নাম। সংস্কৃতিমহলে তিনি ‘ধামাইলের শেষ প্রদীপ’ ও ‘একুশ শতকের চন্দ্রকুমার’ নামে পরিচিত ছিলেন।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে চার শতাধিক ধামাইল,বাউল ও কীর্তন গান সংগ্রহ করেন। এসব গান আজ সিলেটের লোকঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
১৯৭১ সালে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার রুস্তমপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রামকৃষ্ণ সরকার। দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তিনি আছিদউল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। আর্থিক সংকটের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করা সম্ভব না হলেও লোকসঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ কখনোই থেমে থাকেনি।
জীবিকার তাগিদে তিনি শ্রীমঙ্গলের আব্দুস শহীদ কলেজে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০০৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ধামাইল একাডেমি’-শ্রীমঙ্গলের প্রথম ধামাইলভিত্তিক সংগঠন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ধামাইল গান ও নৃত্যের প্রচার,প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সিলেটি ধামাইল গীত’ ধামাইল ঐতিহ্যকে গ্রন্থাকারে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি মাল্টিপল মায়লোমা (এমএম) রোগে ভুগছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও লোকসংস্কৃতির প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা ছিল অটুট।
রামকৃষ্ণ সরকারের বিদায় কেবল একজন শিল্পসাধকের প্রস্থান নয়;এটি সিলেটের লোকজ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। তবে তাঁর সংগ্রহ করা গান,রচিত গ্রন্থ এবং প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সিলেটের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


মতামত