বাংলা পঞ্জিকার ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত দোল পূর্ণিমা এবং একই সময়ে পালিত হোলি উৎসব ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব। এই উৎসব কেবল রঙের উল্লাস নয়, এর অন্তর্নিহিত রয়েছে ভক্তি, প্রেম, অসুরবিনাশ এবং মানবিক সম্প্রীতির গভীর বার্তা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি যেমন আধ্যাত্মিক সাধনার, তেমনি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও এক অনন্য উপলক্ষ।
দোল পূর্ণিমা বিশেষভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানি-এর ঐশ্বরিক প্রেমলীলার স্মরণে উদযাপিত হয়। পুরাণ অনুযায়ী, বৃন্দাবনে এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ সখী ও গোপীদের সঙ্গে রঙের খেলায় মেতে উঠতেন। সেই ঐতিহ্য থেকেই রঙ খেলার প্রথা প্রচলিত হয়েছে। দোলযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ দোলায় প্রতিষ্ঠা করে ভক্তরা আবির ও ফুল দিয়ে আরাধনা করেন। অনেক স্থানে কীর্তন, শোভাযাত্রা ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবের আয়োজন সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে হোলি উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসুরবিনাশ ও ভক্তির জয়গানের এক পৌরাণিক কাহিনি। পুরাণে বর্ণিত আছে অসুররাজ হিরণ্যকশিপু নিজের পুত্র প্রহ্লাদ-কে ভগবান বিষ্ণুর ভক্তি ত্যাগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রহ্লাদ অটল ছিলেন। ক্রোধান্ধ হিরণ্যকশিপু তার বোন হোলিকা-র সাহায্যে প্রহ্লাদকে অগ্নিদগ্ধ করার পরিকল্পনা করেন। হোলিকার ছিল অগ্নিতে অমর থাকার বর। সে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করে। কিন্তু ঈশ্বরকৃপায় ভক্ত প্রহ্লাদ রক্ষা পান এবং হোলিকা দগ্ধ হয়ে বিনাশপ্রাপ্ত হন। এই ঘটনাকেই স্মরণ করে হোলিকার দহন বা ন্যাড়াপোড়া পালিত হয়, যা অসুর শক্তির পরাজয় ও সত্য-ধর্মের জয়ের প্রতীক।
দোল পূর্ণিমা আবার গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই তিথিতেই আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাঁর জন্মতিথি ‘গৌর পূর্ণিমা’ নামে পরিচিত। তিনি প্রেমভক্তির মাধ্যমে মানবসমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভগবৎনামের মাহাত্ম্য প্রচার করেছিলেন। তাই এই দিনে বিভিন্ন মঠ-মন্দিরে নামসংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও মহাপ্রসাদের আয়োজন করা হয়।
ভারত, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে দোল ও হোলি আজ ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলায় মন্দির প্রাঙ্গণ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রঙের আবিরে মুখরিত পরিবেশে মানুষ ভুলে যায় ভেদাভেদ, একে অপরকে রাঙিয়ে তোলে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির রঙে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দোল পূর্ণিমা ও হোলি মানবমনের কলুষ দূর করে নতুন সূচনার আহ্বান জানায়। শীতের অবসান ও বসন্তের আগমনী বার্তার সঙ্গে এই উৎসব প্রকৃতির নবজাগরণকেও প্রতিফলিত করে। অশুভ শক্তির বিনাশ, ভক্তির মহিমা ও প্রেমের জয়—এই তিন মূল দর্শনই দোল ও হোলির অন্তর্নিহিত শিক্ষা।
সময়ের পরিবর্তনে আয়োজনের ধরন বদলালেও দোল পূর্ণিমা ও হোলির চিরন্তন তাৎপর্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এই উৎসব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে
মতামত