সারা দেশে হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে হামের প্রাদুর্ভাব। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ১৯ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। পটুয়াখালী থেকে বরিশাল হয়ে ঢাকা—সর্বত্রই এখন অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে মা-বাবার আর্তনাদ ও হাহাকার শোনা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো হামের টিকা না নেওয়া, টিকার তীব্র সংকট এবং সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত বুস্টার ডোজ প্রদানে চরম অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিশেষ করে গত ২০২০ সালের পর ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের যে বিশেষ বুস্টার ডোজ দেওয়ার কথা ছিল, তা দীর্ঘ চার বছরেও দেওয়া হয়নি। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ভার এখন সাধারণ পরিবারগুলোকে বহন করতে হচ্ছে তাদের প্রিয়জন হারানোর মাধ্যমে।
পটুয়াখালী থেকে আসা ১০ মাসের শিশু ইনারার মা উম্মে কুলসুমের মতো শত শত অভিভাবক এখন হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে ১২০ জনের বেশি হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছেন এবং রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা। হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন উদ্বেগের সাথে জানিয়েছেন যে, টিকাদানের অনিয়মিত পরিস্থিতিই আজকের এই সংকটের মূল কারণ। বিশেষ করে সরকারি পর্যায় থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর যে গণ-টিকাদান কর্মসূচি পালন করা হয়, তার অনুপস্থিতি শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে জীবন রক্ষাকে পরম ধর্ম মনে করা হলেও, টিকার অভাবে এই কোমলমতি শিশুদের জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়া সমগ্র জাতির জন্য এক অশনি সংকেত।
তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতির আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি জানিয়েছেন, হামের সংক্রমণ রোধে ডিএনসিসি হাসপাতালসহ রাজধানীর প্রধান হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া নতুন করে টিকা কেনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষজ্ঞরা হুশিয়ারি দিয়ে বলছেন, স্রেফ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে মহামারি ঠেকানো সম্ভব নয়; বরং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তারা অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুর শরীরে হামের কোনো লক্ষণ দেখা মাত্রই দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে, যাতে কোনোভাবেই আর কোনো কোল খালি না হয়।
মতামত