আজ সারা বিশ্বের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন—সীতা নবমী। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে পালিত এই পবিত্র দিবসটি উৎসর্গ করা হয়েছে সীতা দেবীর আবির্ভাব স্মরণে।
২০২৬ সালে ২৫ এপ্রিল, শনিবার দিনব্যাপী ভক্তরা নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবী সীতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
হিন্দু ধর্মগ্রন্থ রামায়ণ অনুসারে, সীতা কেবল একজন রাজকুমারী বা রানি নন—তিনি সতীত্ব, সহনশীলতা, ত্যাগ ও নৈতিক শক্তির এক অনন্য প্রতীক। তাঁকে দেবী লক্ষ্মীর অবতার এবং ‘ভূদেবী’ বা ধরিত্রী কন্যা হিসেবেও পূজা করা হয়।
পৌরাণিক কাহিনিতে বর্ণিত আছে, মিথিলার রাজা রাজা জনক এক যজ্ঞের প্রস্তুতির সময় মাঠে লাঙল চালানোর সময় মাটির ভেতর থেকে একটি কন্যাশিশুকে আবিষ্কার করেন। এই শিশুকেই তিনি নিজের কন্যা হিসেবে লালন-পালন করেন, যার নাম দেন সীতা। এই অলৌকিক জন্মকাহিনির কারণে সীতাকে “ভূমিজা” বা মাটির কন্যা বলা হয়।
মিথিলার রাজকুমারী হিসেবে বেড়ে ওঠা সীতা পরবর্তীতে অযোধ্যার রাজপুত্র রাম-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
এই দম্পতির জীবনগাঁথা হিন্দু ধর্মে আদর্শ দাম্পত্য জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে তাঁদের জীবন ছিল নানা কঠিন পরীক্ষায় ভরা।
অযোধ্যার রাজনীতি ও পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কারণে রামকে বনবাসে যেতে হলে সীতা স্বেচ্ছায় তাঁর সঙ্গে বনবাসে যান। রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা ছেড়ে স্বামীর পাশে থাকার এই সিদ্ধান্ত সীতার ত্যাগ ও ভালোবাসার গভীরতাকে তুলে ধরে। বনবাসের সময়ই রাক্ষসরাজ রাবণের দ্বারা সীতার অপহরণ ঘটে, যা রামায়ণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রাবণের লঙ্কায় বন্দিদশায় থেকেও সীতা তাঁর সতীত্ব ও নৈতিক দৃঢ়তা বজায় রাখেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাম তাঁকে উদ্ধার করেন। কিন্তু সমাজের প্রশ্ন ও সন্দেহের মুখে সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়—যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের পরও সীতার জীবনে শান্তি স্থায়ী হয়নি। প্রজাদের মধ্যে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠলে রাম, রাজধর্ম রক্ষার জন্য, গর্ভবতী সীতাকে বনবাসে পাঠাতে বাধ্য হন। সেখানে ঋষি বাল্মীকির আশ্রমে তিনি লব ও কুশ নামে দুই পুত্রের জন্ম দেন এবং তাঁদের লালন-পালন করেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে, যখন আবারও তাঁর সতীত্ব প্রমাণের প্রসঙ্গ আসে, তখন সীতা ধরিত্রী মাতার কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং মাটির বুকে বিলীন হয়ে যান। এই ঘটনাকে তাঁর চূড়ান্ত আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
সীতা নবমী উপলক্ষে ভক্তরা উপবাস পালন করেন, দেবী সীতা ও রামের পূজা করেন এবং রামায়ণ পাঠ করেন। বিশেষ করে বিবাহিত নারীরা এই দিনে সংসারের সুখ-শান্তি ও স্বামীর মঙ্গল কামনায় ব্রত পালন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে সীতার পূজা করলে জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ হয়।
বর্তমান সমাজে দেবী সীতার জীবন নারীর সহনশীলতা, আত্মমর্যাদা ও শক্তির এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীবন থেকে মানুষ শিখতে পারে—কঠিন পরিস্থিতিতেও নৈতিকতা ও সত্যের পথে অটল থাকা, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা এবং আত্মসম্মান রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের দিনে, সীতা নবমী কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি এক অনন্য আদর্শ জীবনের স্মরণ, যেখানে ত্যাগের মধ্যে শক্তি, ধৈর্যের মধ্যে মর্যাদা এবং ভালোবাসার মধ্যে অসীম সাহস নিহিত রয়েছে।
মতামত