সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যাপিত জীবনে বৈদিক সংস্কার কেবল কতগুলো আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি মনুষ্য জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণকর করে গড়ে তোলার এক ঐশ্বরিক পদ্ধতি। পবিত্র বেদে বর্ণিত ঋষিদের নির্দেশিত ষোড়শবিধ সংস্কারের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো উপনয়ন। এই উপনয়ন সংস্কারের মাধ্যমেই একজন মানুষ যজ্ঞোপবীত বা পৈতা ধারণ করেন, যা মূলত আত্মিক শুদ্ধি এবং প্রতিজ্ঞার প্রতীক। শাস্ত্রে যজ্ঞোপবীতকে প্রতিজ্ঞাসূত্র বা ব্রতসূত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সাধারণত আট থেকে বারো বছর বয়সের মধ্যে এই উপনয়ন গ্রহণের বিধান থাকলেও বর্তমান সমাজে এর মূল তাৎপর্য এবং অধিকার নিয়ে নানাবিধ বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, বর্তমানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সংকীর্ণতায় নারীরা এই পবিত্র অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা সরাসরি বেদের শিক্ষার পরিপন্থী।
প্রাচীন বৈদিক যুগে কুমারীদেরও উপনয়ন সংস্কার সম্পন্ন হতো। তারা গুরুগৃহে থেকে বেদ পাঠ করতেন, গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ শিখতেন এবং সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা সমাপ্ত করতেন। অথর্ববেদের (১১।৫।১৮) অমিয় বাণীতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে বিদ্যা লাভ করে কুমারী কন্যা সুযোগ্য পতি লাভ করবেন। যেহেতু ব্রহ্মচর্য পালনের পূর্বশর্তই হলো গায়ত্রী মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়া এবং যজ্ঞোপবীত ধারণ করা, তাই শাস্ত্রীয় বিচারে নারীদের পৈতা ধারণের পূর্ণ অধিকার অনস্বীকার্য। হন্দুস নিউজ মনে করে, এই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বর্তমান সময়ের দাবি।
যজ্ঞোপবীত কেবল একটি কার্পাস সূত্র নয়, বরং এটি বৈদিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ছাড়পত্র। যজুর্বেদে (১৯।৩১) উল্লেখ রয়েছে যে, গ্রন্থিযুক্ত যজ্ঞোপবীত ধারণ করে যজ্ঞ সম্পাদন করলেই কেবল যজ্ঞের সম্পূর্ণ ফল লাভ করা সম্ভব। যারা উপবীতহীন, তারা বৈদিক মন্ত্র পাঠ বা ক্রিয়া কর্মের পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেন না। এই সূত্রটি মূলত তিনটি আলাদা সুতার সমন্বয়ে গঠিত, যা ‘ব্রহ্মগ্রন্থি’ বা ঈশ্বর প্রদত্ত পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ। এই তিনটি সূত্র মানুষের জীবনের তিনটি মৌলিক ঋণ—দেবঋণ, পিতৃঋণ ও ঋষিঋণ পরিশোধের কথা মনে করিয়ে দেয়। পরিবেশ ও জীবকুলের প্রতি দায়িত্ব পালনই হলো দেবঋণ; জন্মদাত্রী পিতা-মাতার সেবা হলো পিতৃঋণ এবং গুরু-শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হলো ঋষিঋণ।
যজ্ঞোপবীতের পাঁচটি গিট বা পঞ্চগিট আমাদের জীবনের পাঁচটি প্রধান রিপু—কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা ও মোহকে জয় করার প্রতীক। এটি বাম কাঁধ থেকে ডান দিকের কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে, যাতে সুত্রটি হৃদপিণ্ডের উপর দিয়ে যায়। এর গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ হলো—মানুষ যেন তার প্রতিটি দায়িত্ব হৃদয় থেকে পালন করে। সনাতনীদের এই মহান উত্তরাধিকারকে পুনর্জাগরিত করা এবং শাস্ত্রীয় বিধি মোতাবেক নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আজকের লক্ষ্য।
মতামত