ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে চট্টগ্রাম এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে যে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় অসংখ্য তরুণ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদেরই একজন শহীদ বিপ্লবী কৃষ্ণকুমার চৌধুরী, যিনি কৃষ্ণগোপাল চৌধুরী নামেও পরিচিত। মাত্র কিশোর বয়সেই বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিলেও তাঁর আত্মত্যাগ আজও চট্টগ্রামের বিপ্লবী ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, কৃষ্ণকুমার চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামের কেলিশহরে। তাঁর পিতা ছিলেন হেমেন্দ্রলাল চৌধুরী। ছাত্রজীবনেই তিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন এবং চট্টগ্রামের গোপন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে তরুণদের একটি বড় অংশ স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল।
১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প থেকে কয়েকজন তরুণ বিপ্লবী একটি সাহসী অভিযানের পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৩৪ সালের ৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ইউরোপীয় ক্লাব (পল্টন) মাঠে ক্রিকেট খেলায় অংশ নেওয়া ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। অভিযানে তৎকালীন পুলিশ সুপার পিটার ক্লিয়ারি (Peter Cleary) নিহত হন এবং কয়েকজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা আহত হন। ঘটনাটি ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
হামলার পরপরই ব্রিটিশ সেনা ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন বিপ্লবী নিত্যরঞ্জন সেন ও হিমাংশুবিমল চক্রবর্তী। অপরদিকে কৃষ্ণকুমার চৌধুরী এবং হরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন।
বিচার শেষে কৃষ্ণকুমার চৌধুরী ও হরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। ১৯৩৪ সালের ৫ জুন মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মাধ্যমে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী এই তরুণ বিপ্লবীর বয়স তখন খুব বেশি ছিল না।
ইতিহাসবিদদের মতে, কৃষ্ণকুমার চৌধুরীর আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, স্বাধীনতার সংগ্রাম শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রয়োজন হলে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিল সে সময়ের তরুণ প্রজন্ম। তাঁদের এই আত্মবলিদান পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
স্বাধীনতার আট দশকেরও বেশি সময় পর আজও চট্টগ্রামের বিপ্লবী ঐতিহ্যের আলোচনায় কৃষ্ণকুমার চৌধুরীর নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ইতিহাসের পাতায় তিনি শুধু একজন শহীদ বিপ্লবী নন; তিনি আত্মত্যাগ, সাহস এবং স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
মতামত