শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় দিন-রাত পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। বরিশালের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক এবং মহিষাসুরের প্রতিমায় চলছে মাটির নিখুঁত প্রলেপ ও রং-তুলির আঁচড়। সনাতনী সংস্কৃতির এই মূল ধারক-বাহকেরা যখন ধর্মীয় উৎসবকে রূপ দিতে ঘাম ঝরাচ্ছেন, তখন তাদের জীবনের নেপথ্যে জমে উঠেছে চরম সংকট ও হতাশার কালো মেঘ। দেবী প্রতিমা রূপায়নে উৎসবের আবহে পুরো অঞ্চল মুখরিত হলেও প্রতিমা তৈরির মূল উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে তীব্র অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বরিশালের রূপকাররা। দ্রব্যমূল্য ও উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বাড়লেও পূজা কমিটিগুলোর বাজেট না বাড়ায় মূল লোকসানের ভার বহন করতে হচ্ছে এই শিল্পীদেরই। টিকে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অনেকে নিজেদের দৈনিক খাবার ও জীবনযাত্রার খরচ ছাঁটাই করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা সনাতনী ঐতিহ্যবাহী এই পেশাজীবীদের চরম মানবধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
ফরিদপুরের ভাঙ্গার প্রবীণ মৃৎশিল্পী কার্তিক চন্দ্র পাল এবার বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী শংকর মঠে প্রতিমা গড়ার কাজ করছেন। চরম অনিশ্চয়তার কারণে গত বছরের তুলনায় এবার তিনি কাজের পরিধি কমিয়ে মাত্র ১২টি প্রতিমার কাজ হাতে নিয়েছেন, যার মধ্যে বরিশাল নগরে পাঁচটি এবং বাবুগঞ্জের মাধবপাশায় একটি প্রতিমা রয়েছে। উপকরণের দামের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, গত বছর যে মাটির বস্তা ৩৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এবার তা কিনতে হচ্ছে ৫০০ টাকায়। এছাড়া পাটের দাম প্রতি কেজিতে ১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ২২২০ টাকা, ৬০০ টাকার খড়ের নাড়া ১১০০ টাকা এবং চটের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছে। বাঁশসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের দামও একইভাবে চড়া। পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে দিন-রাত কাজ করা এই শিল্পী আক্ষেপ করে বলেন, একটি প্রতিমা তৈরি করে এক লাখ টাকা চুক্তি করা হলে তার মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার টাকাই চলে যায় কাঁচামাল ও নির্মাণকাজে। অবশিষ্ট টাকা থেকে শ্রমিকদের মজুরি, যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানোর পর হাতের মুঠোয় আর কিছুই থাকে না।
(News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
একই ধরনের বাস্তবতার কথা জানান কার্তিক পালের বড় ভাই রণজিৎ পাল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে কাঁচামালের দাম আকাশচুম্বী হলেও পূজা কমিটিগুলো প্রতিমা ক্রয়ের বাজেট বাড়ায়নি। ফলে চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করতে গিয়ে অনেক সময় পেট ভরে না খেয়ে, একবেলা-দুইবেলা না খেয়েও কাজ করতে হচ্ছে তাদের। কেবল পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আবেগ আঁকড়ে ধরে রাখতেই এই দুর্দিনেও তারা পেশাটি টিকিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠির মৃৎশিল্পী যোগেশ পাল আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, কাঁচামালের চড়া দামে ঐতিহ্যবাহী প্রতিমাশিল্পীদের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির মুখে। যে আয় হয় তা দিয়ে পরিবার ও সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিমাশিল্পীদের এই মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চারুকলা বরিশালের সাবেক সভাপতি সুশান্ত ঘোষ। তিনি জানান, সনাতনী সংস্কৃতি ও মৃৎশিল্পীদের উৎসাহিত করতে প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গাপূজার ষষ্ঠী ও সপ্তমীতে তাঁদের জন্য প্রদর্শনী ও সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বরিশাল জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এবার মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় একটি বেশি। এর মধ্যে জেলা এলাকায় ৫৯০টি এবং মহানগর এলাকায় ৪৭টি মণ্ডপ রয়েছে। উৎসব সামনে রেখে বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বরিশাল মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র সাহা জানান, প্রতিমা গড়ার কাজ প্রায় শেষ এবং সার্বিক নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়া জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জী কুডু জানান, মণ্ডপের নিরাপত্তা ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকারি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সক্রিয় রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মতামত