জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও দায়িত্ব ও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং উপজেলার সারতা গ্রামের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মধুমিতা কর। বাবার নিথর দেহ ঘরে রেখেই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে দেখিয়ে দিল, দৃঢ় মনোবল থাকলে শোককেও জয় করা যায়।
সোমবার ভোররাতে হঠাৎ মধুমিতার ঘুম ভেঙে যায় মায়ের আহাজারিতে। ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখে, বাবা বাদলচন্দ্র কর নিথর হয়ে পড়ে আছেন। দ্রুত স্থানীয় চিকিৎসককে ডাকা হলে তিনি বাদলচন্দ্র করকে মৃত ঘোষণা করেন। মুহূর্তের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা পরিবারে। আগের দিনও বাবার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মধুমিতা। কিন্তু রাত পোহানোর আগেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসাটাই চিরবিদায় নিল।
বাবাই ছিলেন মধুমিতার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে ছিল তাঁর অগাধ স্বপ্ন। এমন অবস্থায় মধুমিতা পরীক্ষায় বসবে কি না—তা নিয়ে যখন এলাকায় আলোচনা চলছিল, তখন খবর পৌঁছায় তার স্কুল সারতা তারকনাথ ইনস্টিটিউটে। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই স্কুলের শিক্ষকরা সকাল সকাল ছাত্রীটির বাড়িতে পৌঁছে তাকে সান্ত্বনা ও সাহস জোগান।
স্কুলের শিক্ষক অজয় বর্মন বলেন, বাবার মৃত্যুতে একটি মেয়ের মানসিক অবস্থা কতটা ভেঙে পড়তে পারে তা তাঁরা বোঝেন। তাই মধুমিতাকে বোঝানো হয়, পরীক্ষায় না বসলে একটি বছর নষ্ট হবে। পাশাপাশি বাবার স্বপ্ন পূরণ করাই হবে তার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। শিক্ষকদের কথায় ধীরে ধীরে নিজেকে শক্ত করে মধুমিতা।
মধুমিতা কর জানায়, বাবার দেহ ছেড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তবু পরিবারের সদস্য ও শিক্ষকদের কথায় সে দশগ্রাম সতীশচন্দ্র সর্বার্থসাধক শিক্ষাসদনের পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষায় বসে। তার জামাইবাবু অনুপ আদক মোটরবাইকে করে তাকে কেন্দ্রে পৌঁছে দেন। মধুমিতাকে কেন্দ্রে রেখে ফিরে এসে পরে বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাদলচন্দ্র কর দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। চিকিৎসাধীন থাকলেও সোমবার ভোরে বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক যুগল প্রধান জানান, মধুমিতা তাদের কাছে নিজের ছাত্রীর মতোই। সে যাতে কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। প্রথম দিনের পরীক্ষা শেষে মধুমিতা জানায়, পরীক্ষা ভালো হয়েছে এবং বাকি পরীক্ষাগুলোও সে দেবে।
মতামত