পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অলিন্দে এখন সবচেয়ে বড় গুঞ্জন ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিনেতা তথা ঘাটালের টানা তিনবারের তৃণমূল সাংসদ দীপক অধিকারী (দেব)। দীর্ঘদিন ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই তারকা সাংসদকে ঘিরে এখন রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি ঘাসফুল শিবিরের দুঃসময়ে মমতার সঙ্গ ছেড়ে বিজেপির ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশ করতে চলেছেন দেব? সাম্প্রতিক দুটি বড় ঘটনা এই জল্পনার আগুনে ঘি ঢেলেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই জল্পনার সূত্রপাত হয় মূলত তৃণমূলের একাংশের বিদ্রোহী সাংসদদের একটি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। লোকসভার স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া একটি বিশেষ চিঠিতে দেবের নাম থাকার দাবি সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। বারাসতের প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, তৃণমূলের অন্তত ২০ জন সাংসদ ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। যদিও কৌশলগত কারণে কারা কারা স্বাক্ষর করেছেন, সেই তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে, নিজের নাম জড়ানো সত্ত্বেও এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে দেব সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করছেন। কোনো প্রকার খণ্ডন বা বিবৃতি না দেওয়ায় তাঁর এই রহস্যজনক নীরবতাই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') দিল্লি সফর শেষ করে কলকাতায় ফেরার পরও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি এই অভিনেতা-সাংসদ। বরং তিনি তড়িঘড়ি চলে যান তাঁর নতুন সিনেমা ‘দেশু৭’-এর শুটিং সেটে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালকের চেয়ারে বসা একটি প্রতীকী সাদা-কালো ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, “Back to where I belong” অর্থাৎ “যেখানে আমার থাকার কথা, সেখানেই ফিরে এলাম।”
দেবের এই পোস্টকে অনেকে রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পুনরায় রূপালি পর্দায় মনোযোগী হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখলেও, ঠিক তার পরপরই ঘটে যাওয়া অন্য একটি ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চাঞ্চল্যকর ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। গত মঙ্গলবার (৯ জুন) পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেন দেব। কোলাঘাটের বলাকা মঞ্চে আয়োজিত এই হাই-প্রোফাইল সভার নেতৃত্বে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে মূল মঞ্চেই শাসক দলের সাংসদ দেবকে উপবিষ্ট থাকতে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বোদ্ধাদের নজর এড়ায়নি।
সনাতনী মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন, সেখানে বিদ্রোহী সাংসদদের তালিকায় নাম জড়ানো এবং তার পরপরই শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক সভায় প্রকাশ্য উপস্থিতি—এই দুই ঘটনাকে কোনোভাবেই আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্য রাজনীতিতে সনাতনীদের অধিকার রক্ষা ও সুশাসনের স্বার্থে এই ধরণের ক্ষমতার ভারসাম্য বদল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এখন পর্যন্ত দেব নিজে তৃণমূল ছাড়ার বা বিজেপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক হাত মেলানোর কোনো ঘোষণা দেননি। উল্লেখ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে আগমন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেও তিনি রাজনীতি ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেব মুখ না খুললেও, তাঁর সাম্প্রতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার দিকে এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্যবাসী।
মতামত