অর্থের কোনো নির্দিষ্ট ভূগোল বা জাতীয় পরিচয় নেই—বিশ্বায়নের এই অমোঘ সত্যটি আবারও প্রমাণ করলেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা রবিন খুদা। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিলিয়নিয়ার এবং বিখ্যাত হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারট্রাঙ্ক’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’-এ প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিশাল ডাটা সেন্টার অবকাঠামো গড়ে তোলার পর, রবিন খুদা এবার তার জীবনের সবচেয়ে বড় ও মেগা বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসছেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দিকে। ভারতের ক্রমবর্ধমান ও স্থিতিশীল প্রযুক্তিখাতে তিনি প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এই বিশাল প্রকল্পের আওতায় পাঁচ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হবে, যা পুরো অঞ্চলের ডিজিটাল মানচিত্র বদলে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, রবিন খুদার এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগকে কেবল সাধারণ কোনো ডাটা সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির এক মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। কিন্তু এই মেগা প্রকল্প প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—যিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করলেন, তিনি নিজের মাতৃভূমিকে বাদ দিয়ে কেন ভারতকে বেছে নিলেন? কেন এই বিশাল পুঁজি বাংলাদেশে এলো না? (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও বাজার গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক বড় বড় বিনিয়োগকারীরা কখনোই আবেগ বা জন্মভূমির টানে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেন না। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে দীর্ঘমেয়াদী পুঁজির নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা প্রথমত বিবেচনা করেন রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনি নিশ্চয়তা, রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা এবং শক্তিশালী অবকাঠামো। ভারত বর্তমানে তাদের প্রযুক্তি, শাসনব্যবস্থা এবং অবকাঠামো খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেছে, যা বিশ্বমঞ্চে সনাতনী সংস্কৃতির চিরন্তন সহনশীলতা ও আধুনিক প্রগতির এক চমৎকার মেলবন্ধন তৈরি করেছে। ফলে সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিশ্বমানের প্রযুক্তি জায়ান্টরা সেখানে ছুটে যাচ্ছে।
পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে এই বিশাল বিনিয়োগ আসতে পারলে দেশটিতে একটি ঐতিহাসিক প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটতে পারত। এর মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার তরুণ ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাদারদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থান তৈরি হতো এবং সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতি এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছাত। তবে বাস্তবতা অত্যন্ত নির্মম। যেকোনো বড় বিনিয়োগ সম্পূর্ণভাবে টিকে থাকে আস্থার পরিবেশের ওপর। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদী ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। রবিন খুদার এই সিদ্ধান্তকে কেবল তার নিজ দেশের প্রতি অনাগ্রহ বা উদাসীনতা হিসেবে দেখা ভুল হবে; বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির এক রূঢ় বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্ব অর্থনীতি এখন আবর্তিত হচ্ছে সুশাসন, নিরাপত্তা ও আস্থার ভিত্তিতে। যে রাষ্ট্র বা অঞ্চল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নীতিগত নিশ্চয়তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার আশ্বাস দিতে পারবে, বৈশ্বিক মূলধনের স্রোত স্বাভাবিক নিয়মেই সেই দিকে ধাবিত হবে। ভারতের এই উত্থান প্রমাণ করে যে, সঠিক দূরদর্শিতা এবং স্থিতিশীল পরিবেশই পারে একটি দেশকে এআই ও আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির মূল কেন্দ্রে পরিণত করতে।
মতামত